পৃথিবীর নিচে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত রহস্য। আমরা যে মাটির উপর দাঁড়িয়ে আছি, তা আসলে নড়ছে। খুব ধীরে, কিন্তু নিয়মিত। এই নড়াচড়ার কারণ হলো টেকটনিক প্লেট। আজকের এই লেখায় আমরা জানব টেকটনিক প্লেট কী, কীভাবে কাজ করে এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ।
টেকটনিক প্লেট কি
টেকটনিক প্লেট হলো পৃথিবীর বাইরের শক্ত আবরণের টুকরা। এগুলো অনেকটা ধাঁধার মতো একসাথে জোড়া লাগানো। পৃথিবীর উপরিভাগ এই প্লেটগুলো দিয়ে তৈরি। প্রতিটি প্লেট অনেক বড় এবং খুব ভারী। এগুলো পৃথিবীর ভেতরের গরম স্তরের উপর ভাসমান। টেকটনিক প্লেট পাথর দিয়ে তৈরি। এই পাথর খুবই শক্ত এবং পুরু। প্লেটগুলো সব সময় একটু একটু করে নড়ে। আমরা বুঝতে পারি না, কিন্তু এগুলো প্রতি বছর কয়েক সেন্টিমিটার সরে যায়। এই সরে যাওয়াই অনেক বড় ঘটনার কারণ হয়। ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি এবং পাহাড় তৈরি হয় এই প্লেটের কারণে। টেকটনিক প্লেট ছাড়া পৃথিবী এমন হতো না।
টেকটনিক প্লেট কতটি

পৃথিবীতে মোট ৭টি প্রধান টেকটনিক প্লেট আছে। এছাড়া আরও অনেক ছোট প্লেট রয়েছে। ছোট প্লেটের সংখ্যা প্রায় ১৫-২০টি। প্রধান প্লেটগুলো অনেক বড় এলাকা জুড়ে থাকে। ছোট প্লেটগুলো মূলত প্রধান প্লেটের মাঝে থাকে। সব মিলিয়ে পৃথিবীর পুরো উপরিভাগ ঢাকা পড়ে। কোনো ফাঁক থাকে না। প্লেটগুলো একে অপরের সাথে লাগানো অবস্থায় থাকে। তবে এরা এক জায়গায় স্থির নয়। প্রতিটি প্লেট নিজের মতো চলে। কখনো এরা একে অপরের দিকে যায়। কখনো আবার দূরে সরে যায়। এই নড়াচড়া খুবই ধীর। কিন্তু লাখ বছরে বড় পরিবর্তন আনে।
মূল বিষয়গুলো:
- পৃথিবীতে ৭টি প্রধান টেকটনিক প্লেট রয়েছে
- ছোট প্লেটের সংখ্যা প্রায় ১৫-২০টি
- সব প্লেট মিলে পৃথিবীর পুরো উপরিভাগ ঢেকে রাখে
- প্লেটগুলো একে অপরের সাথে লাগানো থাকে
- প্রতিটি প্লেট আলাদাভাবে নড়াচড়া করে
টেকটনিক প্লেট কাকে বলে
পৃথিবীর শক্ত বাইরের অংশকে লিথোস্ফিয়ার বলে। এই লিথোস্ফিয়ার অনেকগুলো টুকরায় ভাগ হয়ে আছে। এই টুকরাগুলোকেই টেকটনিক প্লেট বলে। প্রতিটি প্লেট একটা বিশাল এলাকা জুড়ে থাকে। কিছু প্লেট পুরো মহাদেশ ধারণ করে। আবার কিছু প্লেট সমুদ্রের তলায় থাকে। এগুলো পৃথিবীর ম্যান্টলের উপর ভাসে। ম্যান্টল হলো পৃথিবীর গরম এবং নরম স্তর। এই ম্যান্টলের তাপের কারণে প্লেটগুলো নড়ে। টেকটনিক প্লেট বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি ভূগোল এবং ভূতত্ত্ব বোঝার জন্য জরুরি। প্লেট টেকটনিকস তত্ত্ব এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করে।
পৃথিবীতে কয়টি টেকটনিক প্লেট আছে
পৃথিবীতে মোট টেকটনিক প্লেটের সংখ্যা নিয়ে বিজ্ঞানীরা একমত। প্রধান প্লেট ৭টি এবং ছোট প্লেট আরও অনেক। বড় এবং ছোট মিলিয়ে প্রায় ২৫-৩০টি প্লেট আছে। তবে প্রধান প্লেটগুলোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলোর আকার অনেক বড়। প্রতিটি প্রধান প্লেট লাখ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। ছোট প্লেটগুলো মূলত দুই বড় প্লেটের মাঝে থাকে। এগুলোকে মাইক্রোপ্লেট বলা হয়। প্লেটগুলোর সংখ্যা সময়ের সাথে বদলাতে পারে। নতুন প্লেট তৈরি হতে পারে। আবার কিছু প্লেট একসাথে জুড়ে যেতে পারে। তবে এই পরিবর্তন হতে লাখ লাখ বছর লাগে।
প্রধান টেকটনিক প্লেট কয়টি
প্রধান টেকটনিক প্লেট মোট ৭টি। এগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্লেট। প্রতিটি প্লেট একটি বিশাল ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত। এই সাতটি প্লেট পৃথিবীর বেশিরভাগ অংশ জুড়ে আছে। বাকি ছোট প্লেটগুলো এদের মাঝে থাকে। প্রধান প্লেটগুলোর নড়াচড়া বেশি প্রভাব ফেলে। কারণ এগুলো খুব ভারী এবং বড়। এই প্লেটগুলোর সীমানায় বেশিরভাগ ভূমিকম্প হয়। আগ্নেয়গিরিও মূলত এখানে থাকে। প্রধান প্লেটগুলো জানা থাকলে ভূমিকম্প বোঝা সহজ হয়। কোন জায়গায় ঝুঁকি বেশি তাও বোঝা যায়। ভূবিজ্ঞানীরা এই প্লেটগুলো নিয়ে অনেক গবেষণা করেন।
টেকটনিক প্লেটের নাম
সাতটি প্রধান টেকটনিক প্লেটের নির্দিষ্ট নাম আছে। প্রথমটি হলো প্যাসিফিক প্লেট। এটি সবচেয়ে বড় প্লেট। দ্বিতীয়টি নর্থ আমেরিকান প্লেট। এটি উত্তর আমেরিকা মহাদেশ ধারণ করে। তৃতীয়টি ইউরেশিয়ান প্লেট। এটি ইউরোপ এবং এশিয়া জুড়ে বিস্তৃত। চতুর্থটি আফ্রিকান প্লেট। আফ্রিকা মহাদেশ এর উপর অবস্থিত। পঞ্চমটি অ্যান্টার্কটিক প্লেট। এটি অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশকে ধারণ করে। ষষ্ঠটি ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান প্লেট। এটি ভারত এবং অস্ট্রেলিয়া নিয়ে গঠিত। সপ্তমটি দক্ষিণ আমেরিকান প্লেট। দক্ষিণ আমেরিকা এর উপর রয়েছে।
সাতটি প্রধান প্লেটের নাম:
- প্যাসিফিক প্লেট (সবচেয়ে বড়)
- নর্থ আমেরিকান প্লেট
- ইউরেশিয়ান প্লেট
- আফ্রিকান প্লেট
- অ্যান্টার্কটিক প্লেট
- ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান প্লেট
- দক্ষিণ আমেরিকান প্লেট
টেকটনিক প্লেটের চিত্র
টেকটনিক প্লেটের চিত্র দেখলে বিষয়টি সহজ হয়। মানচিত্রে প্লেটগুলো আলাদা রঙে দেখানো হয়। প্রতিটি প্লেটের সীমানা দাগ দিয়ে চিহ্নিত করা থাকে। এই সীমানাগুলোই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানেই ভূমিকম্প বেশি হয়। চিত্রে দেখা যায় প্লেটগুলো কীভাবে সাজানো। কোন প্লেট কোন দিকে নড়ছে তাও দেখানো হয়। তীর চিহ্ন দিয়ে গতি বোঝানো হয়। ভূগোল বইয়ে এই চিত্র পাওয়া যায়। ইন্টারনেটেও অনেক চিত্র আছে। ত্রিমাত্রিক চিত্র দেখলে আরও ভালো বোঝা যায়। প্লেটের পুরুত্ব এবং গভীরতাও দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইট ডেটা দিয়ে এই চিত্র তৈরি করেন।
টেকটনিক প্লেট ছবি
টেকটনিক প্লেটের ছবি শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক। ছবি দেখে বিষয়টি মনে থাকে। রঙিন ছবিতে প্রতিটি প্লেট আলাদা দেখায়। সীমানা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত থাকে। ভূমিকম্পের এলাকা লাল রঙে দেখানো হয়। আগ্নেয়গিরির অবস্থান ত্রিভুজ চিহ্ন দিয়ে দেখানো হয়। পাহাড়ের অবস্থানও চিহ্নিত করা থাকে। ছবিতে সমুদ্রতলের প্লেটও দেখা যায়। মধ্য-সমুদ্র পর্বতমালা বোঝানো থাকে। এই ছবিগুলো ভূগোল পড়ার সময় কাজে লাগে। পরীক্ষায়ও প্রায়ই এমন ছবি আসে। তাই টেকটনিক প্লেটের ছবি মনে রাখা জরুরি।
টেকটনিক প্লেট ম্যাপ
টেকটনিক প্লেট ম্যাপ হলো বিশেষ ধরনের মানচিত্র। এতে পৃথিবীর সব প্লেট দেখানো থাকে। প্রতিটি প্লেটের নাম লেখা থাকে। সীমানা স্পষ্টভাবে আঁকা থাকে। ম্যাপে তিন ধরনের সীমানা দেখানো হয়। ডাইভারজেন্ট সীমানা যেখানে প্লেট আলাদা হয়। কনভারজেন্ট সীমানা যেখানে প্লেট একসাথে আসে। ট্রান্সফর্ম সীমানা যেখানে প্লেট পাশাপাশি সরে। প্রতিটি সীমানা আলাদা চিহ্ন দিয়ে বোঝানো হয়। ম্যাপে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকাও দেখানো থাকে। “রিং অফ ফায়ার” এলাকা বিশেষভাবে চিহ্নিত থাকে। ভূবিজ্ঞানীরা এই ম্যাপ ব্যবহার করে গবেষণা করেন।
টেকটনিক প্লেট ম্যাপে যা থাকে:
- সব প্রধান এবং ছোট প্লেটের অবস্থান
- প্লেট সীমানার ধরন (ডাইভারজেন্ট, কনভারজেন্ট, ট্রান্সফর্ম)
- ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা
- আগ্নেয়গিরির অবস্থান
- প্লেটের নড়াচড়ার দিক
টেকটনিক প্লেট দেখতে কেমন
টেকটনিক প্লেট আসলে দেখা যায় না। কারণ এগুলো মাটির নিচে থাকে। তবে কল্পনায় এগুলো বিশাল পাথরের টুকরা। অনেকটা ভাঙা ডিমের খোসার মতো। পৃথিবীর উপরিভাগ ঢেকে রাখে। প্রতিটি টুকরা অনেক বড় এবং পুরু। পুরুত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। উপরের দিক শক্ত পাথরের। নিচের দিক একটু নরম। রঙ ধূসর বা কালো হতে পারে। পাথরের মধ্যে অনেক খনিজ থাকে। কিছু প্লেট মহাদেশীয়, কিছু সমুদ্রের তলায়। মহাদেশীয় প্লেট হালকা পাথরের। সমুদ্রের প্লেট ভারী পাথরের। তবে আমরা যা দেখি তা প্লেটের উপরের অংশ মাত্র।
টেকটনিক প্লেট কোথায় থাকে
টেকটনিক প্লেট পৃথিবীর উপরিভাগে থাকে। মাটির নিচে কয়েক কিলোমিটার গভীরে। লিথোস্ফিয়ার নামক স্তরে এরা অবস্থান করে। লিথোস্ফিয়ার পৃথিবীর শক্ত বাইরের আবরণ। এর নিচে অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার নামক নরম স্তর আছে। প্লেটগুলো এই নরম স্তরের উপর ভাসে। কিছু প্লেট স্থলভাগের নিচে থাকে। আবার কিছু সমুদ্রের তলদেশে থাকে। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার নিচেই প্লেট রয়েছে। পুরো পৃথিবী এই প্লেট দিয়ে ঢাকা। কোনো জায়গায় ফাঁক নেই। প্লেটের নিচে গরম ম্যান্টল স্তর আছে।
| প্লেটের অবস্থান | বিবরণ | গভীরতা | বৈশিষ্ট্য |
| লিথোস্ফিয়ার | পৃথিবীর শক্ত বাইরের আবরণ | ০-১০০ কিমি | প্লেট এখানে থাকে |
| অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার | নরম ও গরম স্তর | ১০০-৩৫০ কিমি | প্লেট এর উপর ভাসে |
| স্থলভাগ | মহাদেশের নিচে | ৩০-৭০ কিমি পুরু | হালকা পাথরের প্লেট |
| সমুদ্রতল | সমুদ্রের তলদেশে | ৫-১০ কিমি পুরু | ভারী পাথরের প্লেট |
টেকটনিক প্লেট কিভাবে কাজ করে
টেকটনিক প্লেট পৃথিবীর ভেতরের তাপে চলে। পৃথিবীর কেন্দ্র খুব গরম। সেখান থেকে তাপ উপরে আসে। এই তাপ ম্যান্টলকে গরম করে। গরম ম্যান্টল উপরে উঠে আসে। ঠান্ডা হলে আবার নিচে নামে। এভাবে একটি চক্র চলতে থাকে। এই চক্রকে কনভেকশন কারেন্ট বলে। এই কারেন্ট প্লেটগুলোকে ধাক্কা দেয়। ফলে প্লেট নড়তে শুরু করে। কিছু প্লেট একে অপরের দিকে যায়। কিছু প্লেট দূরে সরে যায়। আবার কিছু প্লেট পাশাপাশি সরে। এই নড়াচড়া খুবই ধীর। প্রতি বছর মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার। কিন্তু লাখ বছরে অনেক দূর সরে যায়।
টেকটনিক প্লেটের গতি কত
টেকটনিক প্লেটের গতি খুবই কম। প্রতি বছর মাত্র ২-১৫ সেন্টিমিটার চলে। এটা নখের বৃদ্ধির মতো ধীর। তাই আমরা বুঝতে পারি না। তবে হাজার বছরে এই গতি বড় পরিবর্তন আনে। কিছু প্লেট দ্রুত চলে। আবার কিছু খুব ধীরে চলে। প্যাসিফিক প্লেট সবচেয়ে দ্রুত চলে। এটি বছরে প্রায় ১০ সেন্টিমিটার সরে। ভারতীয় প্লেটও দ্রুত চলে। এটি বছরে প্রায় ৫ সেন্টিমিটার উত্তরে যায়। ইউরেশিয়ান প্লেট ধীরে চলে। বছরে ২-৩ সেন্টিমিটার মাত্র। এই গতি স্যাটেলাইট দিয়ে মাপা হয়। জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা গতি নির্ণয় করেন।
টেকটনিক প্লেট কেন নড়াচড়া করে
টেকটনিক প্লেট নড়ে কারণ পৃথিবীর ভেতর গরম। পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে তাপ বের হয়। এই তাপ ম্যান্টলকে গরম করে। গরম পদার্থ হালকা হয় এবং উপরে ওঠে। ঠান্ডা হলে ভারী হয় এবং নিচে নামে। এই ওঠা-নামা প্লেটকে ধাক্কা দেয়। ফলে প্লেট নড়তে থাকে। এছাড়া প্লেটের নিজের ওজনও কাজ করে। সমুদ্রের প্লেট ভারী হওয়ায় নিচে ডুবে যায়। এই ডুবে যাওয়া অন্য প্লেটকে টানে। মহাকর্ষও একটি কারণ। সব মিলিয়ে প্লেট ক্রমাগত নড়ে। এই নড়াচড়া কোটি বছর ধরে চলছে। ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে।
প্লেট নড়াচড়ার কারণ:
- পৃথিবীর ভেতরের তাপ
- ম্যান্টলে কনভেকশন কারেন্ট
- প্লেটের নিজস্ব ওজন
- মহাকর্ষ বল
- ম্যান্টলের নরম স্তরে ভাসমান অবস্থা
টেকটনিক প্লেট ও ভূমিকম্প
টেকটনিক প্লেট এবং ভূমিকম্প সরাসরি সম্পর্কিত। ভূমিকম্প হয় প্লেটের নড়াচড়ার কারণে। প্লেটগুলো যখন একে অপরের সাথে ঘষে তখন চাপ জমা হয়। একসময় এই চাপ ছেড়ে দেয়। তখনই ভূমিকম্প হয়। প্লেটের সীমানায় বেশিরভাগ ভূমিকম্প ঘটে। তিন ধরনের সীমানায় ভূমিকম্প হয়। যেখানে প্লেট একে অপরের দিকে যায় সেখানে শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। যেখানে প্লেট পাশাপাশি সরে সেখানেও ভূমিকম্প হয়। প্রতিদিন পৃথিবীতে হাজার ভূমিকম্প হয়। তবে বেশিরভাগ খুবই ছোট। মানুষ বুঝতে পারে না। কিন্তু কিছু ভূমিকম্প খুব বড় এবং ক্ষতিকর।
ভূমিকম্প ও টেকটনিক প্লেট সম্পর্ক
ভূমিকম্প এবং টেকটনিক প্লেটের সম্পর্ক গভীর। একটি ছাড়া আরেকটি বোঝা যায় না। প্লেটের নড়াচড়া ভূমিকম্পের মূল কারণ। যেসব জায়গায় প্লেট সীমানা আছে সেখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বেশি। প্রশান্ত মহাসাগরের চারপাশে প্লেট সীমানা বেশি। তাই এখানে ভূমিকম্প বেশি হয়। একে “রিং অফ ফায়ার” বলে। জাপান, ইন্দোনেশিয়া, চিলি এসব দেশে ভূমিকম্প বেশি। কারণ এখানে প্লেট সীমানা আছে। বাংলাদেশও প্লেট সীমানার কাছে। তাই এখানেও ভূমিকম্পের ঝুঁকি আছে। প্লেট নড়াচড়া বুঝে ভূমিকম্প পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। তবে ঠিক কখন হবে তা বলা মুশকিল।
| ভূমিকম্পের ধরন | প্লেট সীমানার ধরন | তীব্রতা | উদাহরণ |
| শক্তিশালী ভূমিকম্প | কনভারজেন্ট (একে অপরের দিকে) | ৭+ মাত্রা | জাপান, নেপাল |
| মাঝারি ভূমিকম্প | ট্রান্সফর্ম (পাশাপাশি) | ৫-৭ মাত্রা | ক্যালিফোর্নিয়া |
| হালকা ভূমিকম্প | ডাইভারজেন্ট (দূরে সরে) | ৩-৫ মাত্রা | আইসল্যান্ড |
| অতি ক্ষুদ্র ভূকম্পন | সব ধরনের সীমানা | ১-৩ মাত্রা | প্রতিদিন সর্বত্র |
আগ্নেয়গিরি ও টেকটনিক প্লেট
আগ্নেয়গিরি এবং টেকটনিক প্লেট ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বেশিরভাগ আগ্নেয়গিরি প্লেট সীমানায় থাকে। যেখানে দুটি প্লেট মিলিত হয় সেখানে ম্যাগমা উপরে আসে। এই ম্যাগমা থেকে আগ্নেয়গিরি তৈরি হয়। যখন এক প্লেট আরেক প্লেটের নিচে ঢোকে তখন আগ্নেয়গিরি হয়। প্লেট গলে গিয়ে ম্যাগমা হয়। এই ম্যাগমা উপরে উঠে আসে। জ্বালামুখ দিয়ে বের হয়ে লাভা হয়। প্রশান্ত মহাসাগরের চারপাশে অনেক আগ্নেয়গিরি আছে। এটাও “রিং অফ ফায়ার” এর অংশ। আইসল্যান্ডে দুটি প্লেট আলাদা হচ্ছে। সেখানে ম্যাগমা উপরে আসে এবং আগ্নেয়গিরি হয়। হাওয়াইয়ের আগ্নেয়গিরি একটু আলাদা। এটি প্লেটের মাঝখানে থাকে। এখানে হট স্পট আছে।
প্লেট টেকটনিকস তত্ত্ব কি
প্লেট টেকটনিকস তত্ত্ব একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। এটি বলে পৃথিবীর উপরিভাগ কয়েকটি প্লেটে ভাগ। এই প্লেটগুলো ধীরে ধীরে নড়ে। এই তত্ত্ব ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ধারণা আরও আগে থেকে ছিল। আলফ্রেড ওয়েগনার ১৯১২ সালে মহাদেশ সরে যাওয়ার কথা বলেন। তাঁর তত্ত্বকে কন্টিনেন্টাল ড্রিফট বলা হয়। পরে আরও প্রমাণ পাওয়া যায়। সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরি হয়। দেখা যায় মধ্য-সমুদ্র পর্বতমালা আছে। এখানে নতুন ভূত্বক তৈরি হয়। এসব প্রমাণ থেকে প্লেট টেকটনিকস তত্ত্ব গড়ে ওঠে। এখন এটি ভূবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি। এই তত্ত্ব দিয়ে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি, পাহাড় সবকিছু ব্যাখ্যা করা যায়।
প্লেট টেকটনিকস তত্ত্ব ব্যাখ্যা
প্লেট টেকটনিকস তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা সহজ। পৃথিবীর বাইরের শক্ত অংশ বড় টুকরায় ভাগ। এই টুকরাগুলো প্লেট নামে পরিচিত। প্লেটগুলো পৃথিবীর নরম স্তরের উপর ভাসে। পৃথিবীর ভেতরের তাপে প্লেট নড়ে। প্লেট তিনভাবে নড়তে পারে। একে অপরের দিকে যেতে পারে। একে অপর থেকে দূরে সরতে পারে। অথবা পাশাপাশি সরতে পারে। এই নড়াচড়ার ফলে ভূমিকম্প হয়। আগ্নেয়গিরি তৈরি হয়। পাহাড় সৃষ্টি হয়। সমুদ্রতলে খাদ তৈরি হয়। লাখ লাখ বছরে মহাদেশের অবস্থান বদলে যায়। এক সময় সব মহাদেশ একসাথে ছিল। প্যানজিয়া নামে একটি বিশাল মহাদেশ ছিল। পরে প্লেট নড়ে আলাদা হয়ে যায়। এভাবে আজকের পৃথিবী তৈরি হয়েছে।
প্লেট টেকটনিকস তত্ত্বের মূল বিষয়:
- পৃথিবীর উপরিভাগ কয়েকটি প্লেটে বিভক্ত
- প্লেটগুলো ম্যান্টলের উপর ভাসমান
- প্লেট তিনভাবে নড়ে (কনভারজেন্ট, ডাইভারজেন্ট, ট্রান্সফর্ম)
- নড়াচড়ার ফলে ভূতাত্ত্বিক ঘটনা ঘটে
- এই প্রক্রিয়া কোটি বছর ধরে চলছে
টেকটনিক প্লেটের প্রকারভেদ
টেকটনিক প্লেট প্রধানত দুই ধরনের হয়। মহাদেশীয় প্লেট এবং মহাসাগরীয় প্লেট। মহাদেশীয় প্লেট মহাদেশের নিচে থাকে। এগুলো পুরু এবং হালকা পাথর দিয়ে তৈরি। গ্রানাইট জাতীয় পাথর বেশি থাকে। পুরুত্ব ৩০-৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত হয়। মহাসাগরীয় প্লেট সমুদ্রের তলদেশে থাকে। এগুলো পাতলা কিন্তু ভারী পাথর দিয়ে তৈরি। বেসাল্ট জাতীয় পাথর বেশি থাকে। পুরুত্ব মাত্র ৫-১০ কিলোমিটার। মহাসাগরীয় প্লেট ভারী হওয়ায় মহাদেশীয় প্লেটের নিচে ঢুকে যায়। এছাড়া কিছু মিশ্র প্লেটও আছে। যেগুলোতে মহাদেশ এবং সমুদ্র দুটোই থাকে। ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান প্লেট এমন একটি উদাহরণ।
মহাদেশীয় টেকটনিক প্লেট
মহাদেশীয় টেকটনিক প্লেট মহাদেশ ধারণ করে। এগুলো পুরু এবং হালকা। হালকা হওয়ায় এরা উপরে থাকে। ডুবে যায় না। মহাদেশীয় প্লেট পুরনো। কোটি বছরের পুরনো পাথর থাকে। পাথর মূলত গ্রানাইট, কোয়ার্টজ এবং ফেল্ডস্পার। এই পাথরগুলো হালকা রঙের। ধূসর বা সাদাটে হয়। মহাদেশীয় প্লেট ঘনত্ব কম। প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে ২.৭ গ্রাম মাত্র। পুরুত্ব বেশি হওয়ায় এরা শক্তিশালী। ভাঙা কঠিন। তবে যখন দুটি মহাদেশীয় প্লেট ধাক্কা খায় তখন পাহাড় তৈরি হয়। হিমালয় পর্বত এভাবেই তৈরি হয়েছে। ভারতীয় প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেট ধাক্কা খেয়ে হিমালয় তৈরি করেছে।
মহাসাগরীয় টেকটনিক প্লেট
মহাসাগরীয় টেকটনিক প্লেট সমুদ্রের তলায় থাকে। এগুলো পাতলা কিন্তু ভারী। ভারী হওয়ায় এরা নিচে থাকে। মহাসাগরীয় প্লেট তুলনামূলক নতুন। সর্বোচ্চ ২০ কোটি বছরের পুরনো। নতুন প্লেট মধ্য-সমুদ্র পর্বতমালায় তৈরি হয়। পাথর মূলত বেসাল্ট। এই পাথর গাঢ় রঙের। কালো বা খয়েরি হয়। মহাসাগরীয় প্লেটের ঘনত্ব বেশি। প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে ৩.০ গ্রাম। পুরুত্ব কম হওয়ায় এরা ভাঙা সহজ। যখন মহাসাগরীয় প্লেট মহাদেশীয় প্লেটের সাথে ধাক্কা খায় তখন নিচে ঢুকে যায়। এই প্রক্রিয়াকে সাবডাকশন বলে। প্রশান্ত মহাসাগরের চারপাশে এমন হচ্ছে। এখানে গভীর সমুদ্র খাদ তৈরি হয়।
| বৈশিষ্ট্য | মহাদেশীয় প্লেট | মহাসাগরীয় প্লেট |
| অবস্থান | মহাদেশের নিচে | সমুদ্রের তলদেশে |
| পুরুত্ব | ৩০-৭০ কিমি | ৫-১০ কিমি |
| ঘনত্ব | ২.৭ গ্রাম/সেমি³ | ৩.০ গ্রাম/সেমি³ |
| প্রধান পাথর | গ্রানাইট | বেসাল্ট |
| বয়স | অতি পুরনো (কোটি বছর) | তুলনামূলক নতুন |
| রঙ | হালকা (ধূসর/সাদা) | গাঢ় (কালো/খয়েরি) |
টেকটনিক প্লেট সীমা (Boundary)
টেকটনিক প্লেট সীমা হলো যেখানে দুটি প্লেট মিলিত হয়। সীমা তিন ধরনের হয়। প্রথম ধরন হলো ডাইভারজেন্ট সীমা। এখানে প্লেট একে অপর থেকে দূরে সরে। মধ্য-সমুদ্র পর্বতমালায় এমন হয়। নতুন ভূত্বক তৈরি হয় এখানে। ম্যাগমা উপরে উঠে আসে। দ্বিতীয় ধরন কনভারজেন্ট সীমা। এখানে প্লেট একে অপরের দিকে যায়। একটি প্লেট অন্যটির নিচে ঢোকে। এখানে পাহাড় এবং গভীর খাদ তৈরি হয়। তৃতীয় ধরন ট্রান্সফর্ম সীমা। এখানে প্লেট পাশাপাশি সরে। ঘষা খায় কিন্তু তৈরি বা ধ্বংস হয় না। এই সীমাগুলোতেই বেশিরভাগ ভূমিকম্প হয়। আগ্নেয়গিরিও এখানে বেশি।
বাংলাদেশে টেকটনিক প্লেট
বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ টেকটনিক অবস্থানে আছে। দেশটি তিনটি প্লেটের কাছে অবস্থিত। ভারতীয় প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট এবং বার্মা মাইক্রোপ্লেট। বাংলাদেশের বেশিরভাগ অংশ ভারতীয় প্লেটে আছে। তবে পূর্ব দিক বার্মা প্লেটের কাছে। এই প্লেটগুলো নড়াচড়া করছে। ভারতীয় প্লেট উত্তর দিকে যাচ্ছে। ইউরেশিয়ান প্লেটের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে। এই ধাক্কার কারণে হিমালয় তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব আছে। দেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বেশি। বিশেষত উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে। প্লেট সীমানা কাছে থাকায় ঝুঁকি বেশি। তাই বাংলাদেশে ভূমিকম্প প্রস্তুতি জরুরি।
বাংলাদেশের টেকটনিক প্লেট অবস্থান
বাংলাদেশের টেকটনিক প্লেট অবস্থান জটিল। দেশ মূলত ভারতীয় প্লেটে আছে। তবে একদম সীমানার কাছে অবস্থিত। পূর্ব দিকে বার্মা মাইক্রোপ্লেট আছে। এটি ভারতীয় এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের মাঝে। সিলেট অঞ্চল বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে প্লেট সীমানা খুব কাছে। দাউকি ফল্ট এখানে আছে। এটি একটি সক্রিয় ফল্ট। চট্টগ্রাম এলাকায়ও ঝুঁকি বেশি। এখানে বার্মা প্লেটের সীমানা আছে। সাবডাকশন জোন কাছে অবস্থিত। ঢাকাও ঝুঁকির মধ্যে আছে। যদিও সরাসরি সীমানায় নয়। তবে বড় ভূমিকম্পের প্রভাব পড়তে পারে। সারা দেশেই ভূমিকম্পের প্রস্তুতি দরকার।
বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা:
- সিলেট (দাউকি ফল্টের কাছে)
- চট্টগ্রাম (বার্মা প্লেট সীমানায়)
- রংপুর (হিমালয়ান ফ্রন্টের প্রভাব)
- ঢাকা (প্লেট সীমানা থেকে দূরে কিন্তু জনবহুল)
- ময়মনসিংহ (মধ্যম ঝুঁকি এলাকা)
ভারতীয় টেকটনিক প্লেট
ভারতীয় টেকটনিক প্লেট একটি বড় প্লেট। এটি ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা ধারণ করে। এছাড়া ভারত মহাসাগরের একটি অংশও এতে আছে। প্লেটটি মহাদেশীয় এবং মহাসাগরীয় দুটোই। উত্তর দিক দিয়ে ইউরেশিয়ান প্লেটের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে। এই ধাক্কায় হিমালয় পর্বত তৈরি হয়েছে। ভারতীয় প্লেট বছরে প্রায় ৫ সেন্টিমিটার উত্তরে যাচ্ছে। এটি একটি দ্রুত চলমান প্লেট। কোটি বছর আগে ভারত আফ্রিকার সাথে ছিল। পরে আলাদা হয়ে উত্তরে সরে আসে। এশিয়ার সাথে ধাক্কা খায়। এখনও ধাক্কা চলছে। তাই হিমালয় এখনও উঁচু হচ্ছে। প্রতি বছর কয়েক মিলিমিটার বাড়ছে।
ইউরেশিয়ান টেকটনিক প্লেট
ইউরেশিয়ান টেকটনিক প্লেট পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহাদেশীয় প্লেট। এটি ইউরোপ এবং এশিয়া জুড়ে বিস্তৃত। রাশিয়া, চীন, জার্মানি, ফ্রান্স সব এই প্লেটে আছে। প্লেটটি অনেক স্থিতিশীল। তবে সীমানায় অনেক কার্যক্রম হয়। দক্ষিণ দিকে ভারতীয় প্লেটের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে। এখানে হিমালয় তৈরি হয়েছে। পূর্ব দিকে প্যাসিফিক প্লেটের সাথে মিলিত হয়। জাপানের কাছে এই সীমানা। এখানে ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরি বেশি। উত্তর আমেরিকান প্লেটের সাথেও সীমানা আছে। আইসল্যান্ডের কাছে এই সীমানা। এখানে প্লেট আলাদা হচ্ছে। ইউরেশিয়ান প্লেট ধীরে চলে। বছরে ২-৩ সেন্টিমিটার মাত্র।
| প্লেটের নাম | আয়তন (মিলিয়ন কিমি²) | ধরন | গতি (সেমি/বছর) |
| প্যাসিফিক প্লেট | ১০৩.৩ | মহাসাগরীয় | ৭-১০ |
| ইউরেশিয়ান প্লেট | ৬৭.৮ | মহাদেশীয় | ২-৩ |
| আফ্রিকান প্লেট | ৬১.৩ | মিশ্র | ২-৩ |
| ভারতীয় প্লেট | ১১.৯ | মিশ্র | ৪-৫ |
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টেকটনিক প্লেট
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টেকটনিক প্লেট হলো প্যাসিফিক প্লেট। এটি ১০ কোটি বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা জুড়ে আছে। পুরো প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ এতে আছে। প্লেটটি সম্পূর্ণ মহাসাগরীয়। কোনো মহাদেশ এতে নেই। তবে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ এতে আছে। প্যাসিফিক প্লেট দ্রুত চলে। বছরে প্রায় ১০ সেন্টিমিটার। এটি পশ্চিম দিকে এবং উত্তর-পশ্চিম দিকে যাচ্ছে। চারপাশে অনেক প্লেট সীমানা আছে। এই সীমানায় “রিং অফ ফায়ার” তৈরি হয়েছে। এখানে পৃথিবীর ৯০% ভূমিকম্প হয়। ৭৫% আগ্নেয়গিরিও এখানে আছে। প্যাসিফিক প্লেট অনেক সক্রিয় এবং গতিশীল। দ্বিতীয় বড় প্লেট হলো ইউরেশিয়ান প্লেট।
টেকটনিক প্লেটের কারণে ভূমিরূপ
টেকটনিক প্লেট পৃথিবীর ভূমিরূপ তৈরি করে। প্লেটের নড়াচড়া থেকে পাহাড়, উপত্যকা, দ্বীপ সব তৈরি হয়। যখন দুটি মহাদেশীয় প্লেট ধাক্কা খায় তখন পাহাড় তৈরি হয়। হিমালয়, আল্পস, রকি পর্বত এভাবে তৈরি। যখন মহাসাগরীয় প্লেট মহাদেশীয় প্লেটের নিচে ঢোকে তখন গভীর খাদ হয়। মারিয়ানা ট্রেঞ্চ এভাবে তৈরি। এখানে আগ্নেয়গিরিও হয়। আন্দিজ পর্বত এভাবে তৈরি হয়েছে। যখন প্লেট আলাদা হয় তখন ফাটল এবং উপত্যকা তৈরি হয়। পূর্ব আফ্রিকার গ্রেট রিফট ভ্যালি এভাবে তৈরি। মধ্য-সমুদ্র পর্বতমালাও এভাবে তৈরি। দ্বীপ তৈরি হয় আগ্নেয়গিরি থেকে। জাপান, ইন্দোনেশিয়া এভাবে তৈরি হয়েছে।
টেকটনিক প্লেট কেন ভূমিকম্প হয়

টেকটনিক প্লেটের কারণে ভূমিকম্প হয় চাপ জমা এবং ছেড়ে দেওয়ার জন্য। প্লেট যখন নড়ে তখন ঘষা খায়। সীমানায় চাপ জমতে থাকে। পাথর চাপ সহ্য করতে পারে একটি সীমা পর্যন্ত। সীমা অতিক্রম করলে পাথর ভেঙে যায়। হঠাৎ করে চাপ ছেড়ে দেয়। এই মুহূর্তে ভূমিকম্প হয়। শক্তি তরঙ্গ আকারে চারদিকে ছড়িয়ে যায়। মাটি কাঁপতে থাকে। যত চাপ জমা হবে ভূমিকম্প তত শক্তিশালী হবে। কিছু জায়গায় প্লেট আটকে থাকে। অনেকদিন নড়ে না। চাপ জমতে থাকে। যখন নড়ে তখন বড় ভূমিকম্প হয়। ক্যালিফোর্নিয়ার সান আন্দ্রেয়াস ফল্ট এমন একটি জায়গা। এখানে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি আছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের এলাকা আছে।
ভূমিকম্প হওয়ার ধাপ:
- প্লেট সীমানায় নড়াচড়া শুরু
- পাথরে ঘষা এবং চাপ জমা হওয়া
- চাপ সহনীয় সীমা অতিক্রম করা
- পাথর হঠাৎ ভেঙে যাওয়া
- শক্তি তরঙ্গ আকারে বিকিরণ
- ভূমিকম্প অনুভূত হওয়া
ভূতত্ত্ব সম্পর্কিত আরও পোস্ট দেখতে
👉 ভূতত্ত্ব ক্যাটাগরি দেখুন।
উপসংহার
টেকটনিক প্লেট পৃথিবীর একটি মৌলিক বিষয়। এগুলো ছাড়া পৃথিবী এমন হতো না। প্লেটের নড়াচড়া কোটি বছর ধরে চলছে। ভবিষ্যতেও চলবে। এই নড়াচড়া থেকে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি এবং পাহাড় তৈরি হয়। মহাদেশের অবস্থান বদলে যায়। সমুদ্র তৈরি এবং বন্ধ হয়। পৃথিবী একটি জীবন্ত গ্রহ। সব সময় পরিবর্তন হচ্ছে। টেকটনিক প্লেট এই পরিবর্তনের চালক। প্লেট বুঝলে ভূগোল বোঝা সহজ। ভূমিকম্প কেন হয় তা বোঝা যায়। কোথায় ঝুঁকি বেশি তা জানা যায়। বাংলাদেশ প্লেট সীমানার কাছে অবস্থিত। তাই আমাদের জন্য এই জ্ঞান আরও গুরুত্বপূর্ণ। ভূমিকম্প প্রস্তুতি নিতে হবে। নিরাপদ ভবন তৈরি করতে হবে। জরুরি পরিকল্পনা থাকতে হবে। টেকটনিক প্লেট সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তাহলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ হবে।
লেখকের নোট: এই নিবন্ধে আমরা টেকটনিক প্লেট সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেছি। প্লেট কী, কীভাবে কাজ করে এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝেছি। ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির সাথে সম্পর্ক জানতে পেরেছি। বাংলাদেশের টেকটনিক অবস্থান সম্পর্কেও ধারণা পেয়েছি। এই জ্ঞান আমাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সাহায্য করবে। পৃথিবীকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)
টেকটনিক প্লেট কী?
টেকটনিক প্লেট হলো পৃথিবীর বাইরের শক্ত আবরণের বড় টুকরা। এগুলো পাথর দিয়ে তৈরি। পৃথিবীর উপরিভাগ এই প্লেট দিয়ে ঢাকা। প্রতিটি প্লেট ধীরে ধীরে নড়ে। এই নড়াচড়া ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির কারণ।
পৃথিবীতে কতটি প্রধান টেকটনিক প্লেট আছে?
পৃথিবীতে ৭টি প্রধান টেকটনিক প্লেট আছে। এছাড়া আরও ১৫-২০টি ছোট প্লেট রয়েছে। প্রধান প্লেটগুলো হলো প্যাসিফিক, ইউরেশিয়ান, আফ্রিকান, নর্থ আমেরিকান, দক্ষিণ আমেরিকান, ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান এবং অ্যান্টার্কটিক প্লেট।
টেকটনিক প্লেট কেন নড়ে?
টেকটনিক প্লেট নড়ে পৃথিবীর ভেতরের তাপের কারণে। পৃথিবীর কেন্দ্র খুব গরম। এই তাপ ম্যান্টলে কনভেকশন কারেন্ট তৈরি করে। এই কারেন্ট প্লেটকে ধাক্কা দেয়। ফলে প্লেট নড়তে থাকে। প্রতি বছর কয়েক সেন্টিমিটার সরে যায়।
টেকটনিক প্লেটের গতি কত?
টেকটনিক প্লেটের গতি বছরে ২-১৫ সেন্টিমিটার। প্যাসিফিক প্লেট সবচেয়ে দ্রুত চলে, প্রায় ১০ সেন্টিমিটার প্রতি বছর। ইউরেশিয়ান প্লেট ধীরে চলে, মাত্র ২-৩ সেন্টিমিটার। এই গতি মাপা হয় জিপিএস প্রযুক্তি দিয়ে।
ভূমিকম্প কীভাবে হয়?
ভূমিকম্প হয় টেকটনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে। প্লেট সীমানায় চাপ জমা হয়। যখন চাপ সহ্যসীমা অতিক্রম করে তখন পাথর ভেঙে যায়। হঠাৎ শক্তি ছেড়ে দেয়। তখন ভূমিকম্প হয়। বেশিরভাগ ভূমিকম্প প্লেট সীমানায় হয়।
বাংলাদেশ কোন টেকটনিক প্লেটে আছে?
বাংলাদেশ মূলত ভারতীয় টেকটনিক প্লেটে আছে। তবে প্লেট সীমানার খুব কাছে অবস্থিত। পূর্ব দিকে বার্মা মাইক্রোপ্লেট এবং উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেট আছে। এই অবস্থানের কারণে দেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বেশি।
প্লেট টেকটনিকস তত্ত্ব কী?
প্লেট টেকটনিকস তত্ত্ব বলে পৃথিবীর উপরিভাগ কয়েকটি প্লেটে ভাগ। এই প্লেট ধীরে নড়ে। এই নড়াচড়া থেকে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি এবং পাহাড় তৈরি হয়। তত্ত্বটি ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন এটি ভূবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি।
মহাদেশীয় এবং মহাসাগরীয় প্লেটের পার্থক্য কী?
মহাদেশীয় প্লেট পুরু, হালকা এবং পুরনো। গ্রানাইট পাথর দিয়ে তৈরি। মহাসাগরীয় প্লেট পাতলা, ভারী এবং নতুন। বেসাল্ট পাথর দিয়ে তৈরি। মহাসাগরীয় প্লেট ভারী হওয়ায় মহাদেশীয় প্লেটের নিচে ঢুকে যায়।
হিমালয় পর্বত কীভাবে তৈরি হয়েছে?
হিমালয় পর্বত তৈরি হয়েছে দুটি মহাদেশীয় প্লেটের ধাক্কায়। ভারতীয় প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেট একে অপরের দিকে যাচ্ছে। ধাক্কার ফলে মাটি উপরে উঠে পাহাড় তৈরি হয়েছে। এই প্রক্রিয়া এখনও চলছে। হিমালয় প্রতি বছর উঁচু হচ্ছে।
“রিং অফ ফায়ার” কী?
“রিং অফ ফায়ার” হলো প্রশান্ত মহাসাগরের চারপাশের একটি এলাকা। এখানে অনেক প্লেট সীমানা আছে। পৃথিবীর ৯০% ভূমিকম্প এখানে হয়। ৭৫% আগ্নেয়গিরিও এখানে অবস্থিত। জাপান, ইন্দোনেশিয়া, চিলি এসব দেশ এই এলাকায় আছে।
টেকটনিক প্লেট কি দেখা যায়?
না, টেকটনিক প্লেট সরাসরি দেখা যায় না। কারণ এগুলো মাটির অনেক গভীরে থাকে। তবে মানচিত্রে প্লেটের সীমানা দেখানো হয়। স্যাটেলাইট প্রযুক্তি দিয়ে প্লেটের নড়াচড়া মাপা হয়। ভূবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে প্লেট সম্পর্কে জানেন।
আগ্নেয়গিরি কেন প্লেট সীমানায় বেশি?
আগ্নেয়গিরি প্লেট সীমানায় বেশি কারণ এখানে ম্যাগমা উপরে আসে। যখন এক প্লেট অন্য প্লেটের নিচে ঢোকে তখন পাথর গলে যায়। এই গলিত পাথর বা ম্যাগমা উপরে উঠে আসে। পৃথিবীর পৃষ্ঠে বের হলে লাভা হয়। এভাবে আগ্নেয়গিরি তৈরি হয়।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টেকটনিক প্লেট কোনটি?
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টেকটনিক প্লেট হলো প্যাসিফিক প্লেট। এটি ১০ কোটি বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা জুড়ে আছে। পুরো প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ এতে রয়েছে। এটি একটি দ্রুত চলমান প্লেট। বছরে প্রায় ১০ সেন্টিমিটার সরে যায়।
টেকটনিক প্লেট কত পুরু?
টেকটনিক প্লেটের পুরুত্ব ভিন্ন হয়। মহাদেশীয় প্লেট ৩০-৭০ কিলোমিটার পুরু। মহাসাগরীয় প্লেট মাত্র ৫-১০ কিলোমিটার পুরু। প্লেট যত পুরু হবে তত শক্তিশালী হবে। মহাদেশীয় প্লেট পুরু হওয়ায় ভাঙা কঠিন।
ভবিষ্যতে মহাদেশের অবস্থান বদলাবে?
হ্যাঁ, ভবিষ্যতে মহাদেশের অবস্থান বদলাবে। টেকটনিক প্লেট ক্রমাগত নড়ছে। কোটি বছর পর মহাদেশ অন্য জায়গায় থাকবে। বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন ২৫ কোটি বছর পর সব মহাদেশ আবার একসাথে হবে। নতুন একটি সুপারকন্টিনেন্ট তৈরি হবে।
🔥 পোস্টটি শেয়ার করুনঃ 📲






