ইসলামে দাজ্জাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি কেয়ামতের বড় আলামতগুলোর মধ্যে একটি। প্রতিটি মুসলমানের উচিত দাজ্জাল সম্পর্কে জানা। কারণ এই ফিতনা অত্যন্ত ভয়ংকর হবে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বারবার এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
দাজ্জাল শব্দের অর্থ হলো প্রতারক বা মিথ্যাবাদী। সে মানুষকে বিভ্রান্ত করবে। তার ফিতনা থেকে বাঁচা খুব কঠিন হবে। তাই প্রত্যেক নবী তাদের উম্মতকে দাজ্জাল থেকে সতর্ক করেছেন। মহানবী (সা.) বলেছেন এটি সবচেয়ে বড় ফিতনা।
এই নিবন্ধে আমরা দাজ্জাল সম্পর্কে বিস্তারিত জানব। তার পরিচয়, লক্ষণ এবং ফিতনা নিয়ে আলোচনা করব। সাথে থাকবে কোরআন ও হাদিসের রেফারেন্স। চলুন শুরু করা যাক।
দাজ্জাল সম্পর্কে হাদিস
রাসুলুল্লাহ (সা.) দাজ্জাল সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণনা করেছেন। প্রায় প্রতিটি খুতবায় তিনি এ বিষয়ে আলোচনা করতেন। হাদিসে দাজ্জালের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, “তিনটি বিষয় বের হলে ঈমান আনা কাজে আসবে না। তার মধ্যে একটি হলো দাজ্জাল।” (মুসলিম)
হযরত হুজায়ফা (রা.) বর্ণনা করেন যে নবীজি (সা.) বলেছেন, “আমি দাজ্জালকে এত ভালো চিনি যে তার পিতা-মাতাকেও এতটা চিনি না।” (মুসনাদে আহমাদ)
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, দাজ্জাল হবে সবচেয়ে বড় ফিতনা। আদম (আ.) সৃষ্টির পর থেকে কেয়ামত পর্যন্ত এর চেয়ে বড় ফিতনা হবে না। (মুসলিম)
হাদিসে দাজ্জালের শারীরিক বৈশিষ্ট্যও বর্ণিত হয়েছে। তার চেহারা, উচ্চতা এবং বিশেষ চিহ্নগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, তার ডান চোখ অন্ধ হবে। সেটি দেখতে ভাসমান আঙুরের মতো হবে।
একটি হাদিসে আছে, দাজ্জাল মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না। ফেরেশতারা মদিনার প্রবেশপথগুলো পাহারা দেবেন। (বুখারি ও মুসলিম)
হযরত উম্মে শারিক (রা.) বর্ণনা করেন, মানুষ দাজ্জালের ভয়ে পাহাড়ে পালিয়ে যাবে। (মুসলিম)
নবী করিম (সা.) বলেছেন, যে সুরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করবে সে দাজ্জাল থেকে রক্ষা পাবে। (মুসলিম)
দাজ্জাল কে
দাজ্জাল হলো এমন এক ব্যক্তি যে নিজেকে খোদা বলে দাবি করবে। সে মানুষকে নিজের ইবাদত করতে বলবে। এটি হবে ঈমানের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আরবি ‘দাজ্জাল’ শব্দটি ‘দাজল’ থেকে এসেছে। এর অর্থ মিথ্যা দিয়ে সত্য ঢেকে দেওয়া। সে সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য বলে প্রচার করবে।
হাদিসে তাকে ‘মাসিহ আদ-দাজ্জাল’ বলা হয়েছে। ‘মাসিহ’ মানে যার চোখ মোছা বা নিশ্চিহ্ন। তার এক চোখ অন্ধ হওয়ার কারণে এই নাম।
দাজ্জাল মানুষের রূপে আসবে কিন্তু তার ক্ষমতা অস্বাভাবিক হবে। আল্লাহ তাকে পরীক্ষার জন্য বিশেষ শক্তি দেবেন। মানুষ তার অলৌকিক কাজ দেখে বিভ্রান্ত হবে।
সে দাবি করবে যে সে-ই প্রকৃত খোদা। মানুষকে বলবে তার ইবাদত করতে। যারা মানবে না তাদের শাস্তি দেবে। যারা মানবে তাদের পুরস্কার দেবে।
ইসলামি স্কলাররা বলেন, দাজ্জাল আদম সন্তান হবে। তবে তার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের মতো নয়। শয়তান তার প্রধান সহায়ক হবে।
দাজ্জাল একজন ইহুদি হবে বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। ইসফাহানের সত্তর হাজার ইহুদি তার অনুসারী হবে। তারা সবাই চওড়া শাল পরিধান করবে। (মুসলিম)
প্রতিটি নবী তাদের জাতিকে দাজ্জাল থেকে সতর্ক করেছেন। হযরত নূহ (আ.) থেকে শুরু করে মুহাম্মাদ (সা.) পর্যন্ত সবাই। এটি প্রমাণ করে এই ফিতনা কত ভয়ানক।
- দাজ্জাল মানে প্রতারক বা মিথ্যাবাদী
- সে নিজেকে খোদা দাবি করবে
- তার এক চোখ অন্ধ হবে
- সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য বলবে
- শয়তান তার প্রধান সহায়ক
- সে একজন ইহুদি হবে
- সত্তর হাজার ইহুদি তার অনুসারী হবে
- প্রতিটি নবী তাদের উম্মতকে সতর্ক করেছেন
দাজ্জাল কবে আসবে

দাজ্জালের আগমনের সঠিক সময় কেউ জানে না। শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালাই এটি জানেন। তবে কিছু নিদর্শন থাকবে যা দেখে বোঝা যাবে।
হাদিসে বলা হয়েছে কেয়ামতের আগে দাজ্জাল আসবে। এটি কেয়ামতের বড় দশটি আলামতের মধ্যে একটি। কিন্তু কোন সাল বা শতাব্দীতে আসবে তা বলা হয়নি।
রাসুল (সা.) বলেছেন, যখন মানুষের মধ্যে ধর্মহীনতা বাড়বে তখন সে আসবে। যখন মানুষ দুনিয়ার পেছনে পাগল হয়ে যাবে। যখন ন্যায়বিচার কমে যাবে এবং জুলুম বাড়বে।
কিছু ছোট আলামত পূরণ হওয়ার পর দাজ্জাল আসবে। যেমন জ্ঞানের কমতি, অজ্ঞতার বৃদ্ধি এবং মূর্খতার প্রসার। এসব দেখা যাচ্ছে বর্তমান যুগে।
হাদিসে আরও বলা হয়েছে, মানুষ যখন সম্পদ নিয়ে গর্ব করবে তখন। যখন বড় বড় ইমারত তৈরি হবে। যখন দরিদ্র মানুষ নেতা হয়ে যাবে।
ইমাম মাহদির আগমনের পর দাজ্জাল আসবে বলে অনেক স্কলার মনে করেন। মাহদি যখন মুসলিমদের নেতৃত্ব দেবেন তখন দাজ্জাল বের হবে।
একটি হাদিসে আছে তিনটি কঠিন বছর দাজ্জালের আগমনের পূর্বে আসবে। সেই সময় খরা ও দুর্ভিক্ষ হবে। মানুষ কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়বে। (আবু দাউদ)
অনেকে মনে করেন আমরা শেষ যুগে আছি। কেয়ামতের অনেক নিদর্শন প্রকাশ পাচ্ছে। তাই দাজ্জালের আগমন খুব বেশি দূরে নয়।
দাজ্জাল কোথা থেকে বের হবে
হাদিসে দাজ্জালের বের হওয়ার স্থান সম্পর্কে উল্লেখ আছে। তবে সঠিক স্থান নিয়ে কিছু ভিন্ন মত রয়েছে। বেশিরভাগ হাদিস অনুযায়ী সে পূর্ব দিক থেকে আসবে।
একটি হাদিসে বলা হয়েছে খোরাসান থেকে দাজ্জাল বের হবে। খোরাসান বর্তমানে ইরান ও আফগানিস্তানের কিছু অংশ। তামিম দারি (রা.) বর্ণিত হাদিসে পূর্বের সমুদ্রের কথা আছে।
হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন দাজ্জাল ইসফাহান থেকে বের হবে। ইসফাহান ইরানের একটি শহর। সেখানকার ইহুদিরা তার প্রথম অনুসারী হবে। (মুসলিম)
আরেকটি বর্ণনায় আছে সে পূর্বের একটি দ্বীপ থেকে আসবে। সেখানে সে বন্দি আছে। যখন আল্লাহর নির্দেশ হবে তখন সে মুক্ত হবে।
তামিম দারি (রা.) এর দীর্ঘ হাদিসে বলা হয়েছে। একটি দ্বীপে দাজ্জাল শিকল দিয়ে বাঁধা আছে। এক অদ্ভুত প্রাণী তাকে পাহারা দিচ্ছে। (মুসলিম শরিফ)
কিছু স্কলার বলেন সে মদিনা ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থান থেকে আসবে। তবে এই মত কম প্রচলিত।
যেখান থেকেই আসুক না কেন সে মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না। ফেরেশতারা মদিনার সব প্রবেশপথ পাহারা দেবেন। সে মক্কায়ও যেতে পারবে না।
দাজ্জাল প্রথমে সিরিয়া ও ইরাকের দিকে যাবে। তারপর সারা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াবে। শুধু মক্কা ও মদিনা ছাড়া সব জায়গায় যাবে।
- খোরাসান থেকে বের হতে পারে
- ইসফাহান থেকে আসার সম্ভাবনা বেশি
- পূর্ব দিকের একটি দ্বীপে বন্দি আছে
- বর্তমানে শিকলে বাঁধা অবস্থায়
- ইসফাহানের ইহুদিরা প্রথম অনুসারী হবে
- মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না
- মক্কাতেও যেতে পারবে না
- সারা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াবে
দাজ্জাল কোন দেশে জন্মগ্রহণ করবে
দাজ্জালের জন্মস্থান সম্পর্কে সরাসরি কোনো হাদিস নেই। তবে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অনেক স্কলার মনে করেন সে মধ্যপ্রাচ্যে জন্ম নেবে।
হাদিসে বলা হয়েছে সে ইহুদি বংশে জন্ম নেবে। তার পিতা-মাতা উভয়েই ইহুদি হবে। এই তথ্য থেকে বোঝা যায় তার জন্ম ইহুদি অধ্যুষিত এলাকায়।
কিছু ঐতিহাসিক বলেন ইসফাহানে সে জন্ম নিতে পারে। কারণ সেখান থেকেই সে প্রথম বের হবে। সত্তর হাজার ইহুদি সেখান থেকে তাকে অনুসরণ করবে।
আরেকটি মত হলো সে লেভান্ট অঞ্চলে জন্ম নেবে। লেভান্ট মানে সিরিয়া, জর্ডান, প্যালেস্টাইন এলাকা। এই অঞ্চল ইহুদি-খ্রিস্টান ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
দাজ্জাল কোথায় জন্ম নেবে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার পরিচয় জানা। কারণ জন্মস্থান তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় ইসলামে।
রাসুল (সা.) তার বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে মানুষকে সতর্ক করেছেন। যাতে মানুষ তাকে চিনতে পারে এবং তার ফিতনা থেকে বাঁচতে পারে।
কিছু আলেম বলেন হয়তো সে এমন কোথাও জন্ম নিয়েছে যা মানুষ জানে না। হতে পারে সে এখনো জীবিত আছে কোথাও লুকিয়ে।
মূল কথা হলো তার জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক না করে তার থেকে বাঁচার প্রস্তুতি নেওয়া। ঈমান মজবুত রাখা এবং দোয়া করা জরুরি।
দাজ্জাল এখন কোথায় আছে
দাজ্জাল এখন কোথায় আছে এই প্রশ্নের উত্তর হাদিসে পাওয়া যায়। তামিম দারি (রা.) বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে এর বর্ণনা আছে।
হযরত তামিম দারি (রা.) এবং তার সাথীরা সমুদ্রযাত্রায় ছিলেন। তারা ঝড়ে পড়ে এক দ্বীপে আশ্রয় নেন। সেখানে তারা এক অদ্ভুত প্রাণী দেখেন।
সেই প্রাণী নিজেকে ‘জাসসাসা’ বলে পরিচয় দেয়। সে তাদের এক গির্জায় নিয়ে যায়। সেখানে এক ব্যক্তি শিকলে বাঁধা ছিল।
সেই বন্দি ব্যক্তি নিজেকে দাজ্জাল বলে পরিচয় দেয়। সে বিভিন্ন প্রশ্ন করে। মক্কা ও মদিনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। (মুসলিম শরিফ)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায় দাজ্জাল একটি দ্বীপে বন্দি আছে। সে শিকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় আছে। আল্লাহর হুকুম হলে সে মুক্ত হবে।
ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, দাজ্জাল পূর্বের সমুদ্রের কোনো দ্বীপে আছে। সেটি কোথায় তা আল্লাহই ভালো জানেন।
অনেক স্কলার বলেন বারমুডা ট্রাইএঙ্গেলের কাছাকাছি হতে পারে। তবে এটি শুধু ধারণা মাত্র। সঠিক স্থান কেউ জানে না।
দাজ্জালের বর্তমান অবস্থান:
| বিষয় | বিবরণ |
| অবস্থান | পূর্ব দিকের এক দ্বীপে |
| অবস্থা | শিকলে বাঁধা |
| পাহারাদার | জাসসাসা নামক প্রাণী |
| মুক্তির সময় | আল্লাহর হুকুম হলে |
দাজ্জাল সেখানে বসে পৃথিবীর খবর নেয়। জাসসাসা তাকে খবর সরবরাহ করে। সে অপেক্ষা করছে মুক্তির জন্য।
- পূর্বের এক দ্বীপে বন্দি আছে
- শিকলে বাঁধা অবস্থায় রয়েছে
- জাসসাসা নামক প্রাণী পাহারা দিচ্ছে
- মক্কা ও মদিনা সম্পর্কে খবর নেয়
- তামিম দারি (রা.) তাকে দেখেছিলেন
- আল্লাহর হুকুম না হলে মুক্ত হবে না
- সঠিক অবস্থান আল্লাহই জানেন
- মুক্তির জন্য অপেক্ষা করছে
দাজ্জালের চেহারা কেমন
দাজ্জালের চেহারা সম্পর্কে হাদিসে বিস্তারিত বর্ণনা আছে। রাসুল (সা.) তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। যাতে মানুষ তাকে সহজে চিনতে পারে।
হাদিসে বলা হয়েছে দাজ্জাল লাল বর্ণের হবে। তার শরীর মোটা এবং উচ্চতা বেশি হবে। চুল অনেক ঘন এবং কোঁকড়ানো থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তার এক চোখ। ডান চোখ অন্ধ হবে। সেটি দেখতে ভাসমান আঙুরের মতো হবে। (বুখারি ও মুসলিম)
হযরত ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন তার চোখ ফুলে থাকবে। দেখতে অসুন্দর লাগবে।
কপালে ‘কাফির’ শব্দ লেখা থাকবে। প্রতিটি মুমিন এই লেখা পড়তে পারবে। এমনকি নিরক্ষর মুসলমানও পড়তে পারবে। (মুসলিম শরিফ)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন তার মাথা খসখসে হবে। কান ছোট এবং বাঁকা থাকবে।
দাজ্জাল সন্তানহীন হবে। তার কোনো সন্তান হবে না। এটিও তার একটি বিশেষ চিহ্ন।
দাজ্জালের শারীরিক বৈশিষ্ট্য টেবিল:
| বৈশিষ্ট্য | বর্ণনা |
| বর্ণ | লাল রঙের |
| উচ্চতা | লম্বা |
| চুল | ঘন ও কোঁকড়ানো |
| ডান চোখ | অন্ধ ও ফুলে যাওয়া |
| কপাল | ‘কাফির’ লেখা |
| দেহ | মোটা ও শক্তিশালী |
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) দাজ্জালের বর্ণনা এত স্পষ্টভাবে দিয়েছেন। যেন তিনি তাকে সামনে দেখছেন।
দাজ্জালকে দেখতে ভয়ংকর লাগবে। কিন্তু অনেকে তার বাহ্যিক চেহারায় প্রতারিত হবে। তার ক্ষমতা দেখে বিভ্রান্ত হয়ে যাবে।
দাজ্জালের এক চোখ কেন অন্ধ
দাজ্জালের এক চোখ অন্ধ হওয়া তার প্রধান নিদর্শন। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য একটি স্পষ্ট চিহ্ন। যাতে মুমিনরা তাকে চিনতে পারে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা কখনো এক চোখ বিশিষ্ট নন। কিন্তু দাজ্জাল এক চোখবিশিষ্ট হবে। (বুখারি ও মুসলিম)
এই অন্ধ চোখ প্রমাণ করবে যে সে খোদা নয়। আল্লাহ পরিপূর্ণ এবং কোনো ত্রুটি নেই তাঁর। কিন্তু দাজ্জাল ত্রুটিপূর্ণ।
আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, দাজ্জালের ডান চোখ অন্ধ হবে। এটি আঙুরের মতো দেখাবে। চোখের উপর পাতলা চামড়া থাকবে।
হাদিসে আরও বলা হয়েছে, তার চোখ ভাসমান থাকবে। চোখটি বাইরে বেরিয়ে আসবে। দেখতে খুবই কুৎসিত লাগবে।
এই অ্যান্ধত্ব তার দুর্বলতার প্রমাণ। যে নিজেকে খোদা দাবি করে সে কীভাবে অন্ধ হতে পারে? এটি মুমিনদের জন্য চিন্তার বিষয়।
অনেক স্কলার বলেন, এক চোখ অন্ধ মানে আধ্যাত্মিক অন্ধত্বও। সে শুধু দুনিয়া দেখবে। আখেরাত সম্পর্কে অন্ধ থাকবে।
ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, এই চিহ্ন এত স্পষ্ট যে কেউ বিভ্রান্ত হতে পারবে না। যদি সে কপালের লেখা দেখতে না পায় তবু চোখ দেখে চিনবে।
আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের জন্য এই চিহ্ন রেখেছেন। যাতে তারা সহজেই প্রতারকটিকে চিনতে পারে। এবং তার ফিতনা থেকে বাঁচতে পারে।
দাজ্জালের কাহিনী
দাজ্জালের কাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি নবী তাদের উম্মতকে এই কাহিনী শুনিয়েছেন। হযরত নূহ (আ.) থেকে শুরু করে মুহাম্মাদ (সা.) পর্যন্ত।
হাদিসে আছে, দাজ্জাল আদম (আ.) এর সন্তান। সে মানুষ হিসেবে জন্ম নেবে। কিন্তু আল্লাহ তাকে বিশেষ শক্তি দেবেন ফিতনা হিসেবে।
শৈশবে সে সাধারণ মানুষের মতো থাকবে। কিন্তু বড় হয়ে তার মধ্যে শয়তানি শক্তি প্রবেশ করবে। শয়তান তার প্রধান সহায়ক হবে।
একসময় সে নিজেকে নবী দাবি করবে। মানুষকে বলবে আল্লাহ তাকে পাঠিয়েছেন। কিছু মূর্খ মানুষ বিশ্বাস করবে।
তারপর সে দাবি করবে নিজেকে খোদা হিসেবে। বলবে সে-ই সৃষ্টিকর্তা। যারা তাকে মানবে তাদের জান্নাত দেবে। যারা মানবে না তাদের জাহান্নাম দেবে।
- আদম সন্তান হিসেবে জন্ম নেবে
- ইহুদি পরিবারে বড় হবে
- প্রথমে নবুয়্যাতের দাবি করবে
- পরে খোদায়ির দাবি করবে
- শয়তান তার প্রধান সাথী
- অলৌকিক শক্তি প্রদর্শন করবে
- মানুষকে বিভ্রান্ত করবে
- চল্লিশ দিন পৃথিবীতে থাকবে
দাজ্জাল প্রথম দিন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাবে। দ্বিতীয় দিন এক মাসের সমান হবে। তৃতীয় দিন এক সপ্তাহের সমান। (মুসলিম)
বাকি দিনগুলো সাধারণ দিনের মতো হবে। সে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াবে। শুধু মক্কা ও মদিনা ছাড়া সব জায়গায় যাবে।
তার সাথে থাকবে জান্নাত ও জাহান্নাম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার জান্নাত হবে জাহান্নাম। এবং তার জাহান্নাম হবে জান্নাত। (মুসলিম)
যারা তাকে মানবে তারা দুনিয়ার সুখ পাবে। কিন্তু আখেরাতে জাহান্নামে যাবে। যারা মানবে না তারা কষ্ট পাবে। কিন্তু আখেরাতে জান্নাতে যাবে।
এই কাহিনী শুনে সাহাবারা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। রাসুল (সা.) তাদের সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে।
দাজ্জালের ফিতনা
দাজ্জালের ফিতনা হবে সবচেয়ে ভয়ংকর। আদম (আ.) সৃষ্টি থেকে কেয়ামত পর্যন্ত এর চেয়ে বড় ফিতনা হবে না। রাসুল (সা.) বারবার এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
প্রথম ফিতনা হলো নিজেকে খোদা দাবি করা। এটি সবচেয়ে বড় শিরক। যারা দুর্বল ঈমানের তারা বিভ্রান্ত হবে।
দ্বিতীয় ফিতনা হলো অলৌকিক কাজ প্রদর্শন করা। সে আকাশকে বৃষ্টি বর্ষণের আদেশ দেবে। আকাশ বৃষ্টি দেবে। জমিনকে ফসল উৎপাদনের আদেশ দেবে। জমিন ফসল দেবে। (মুসলিম)
তৃতীয় ফিতনা হবে মৃতকে জীবিত করা। এক যুবককে হত্যা করবে। তারপর তাকে জীবিত করবে। এতে অনেকে বিভ্রান্ত হবে। (বুখারি)
দাজ্জালের প্রধান ফিতনা:
| ফিতনার ধরণ | বর্ণনা |
| খোদায়ির দাবি | নিজেকে সৃষ্টিকর্তা বলা |
| অলৌকিক ক্ষমতা | বৃষ্টি ও ফসল নিয়ন্ত্রণ |
| মৃত জীবিত করা | যুবককে হত্যা ও জীবিত করা |
| ধন-সম্পদ | বিশাল সম্পদের প্রলোভন |
| শাস্তি | অবাধ্যদের শাস্তি প্রদান |
চতুর্থ ফিতনা হলো ধন-সম্পদের প্রাচুর্য। যারা তাকে মানবে তাদের অঢেল সম্পদ দেবে। দরিদ্র মানুষ প্রলোভনে পড়বে।
পঞ্চম ফিতনা হবে যারা মানবে না তাদের শাস্তি। তাদের সব সম্পদ নষ্ট করবে। জমিন শুষ্ক হয়ে যাবে। বৃষ্টি বন্ধ হবে।
হাদিসে আছে, এক গ্রামে সে যাবে। সবাই তাকে অস্বীকার করবে। সাথে সাথে তাদের সব সম্পদ নষ্ট হয়ে যাবে। পশু মারা যাবে। (মুসলিম)
আরেক গ্রামে যাবে। সবাই তাকে মানবে। সাথে সাথে বৃষ্টি হবে। ফসল ফলবে। পশু মোটা তাজা হবে।
দাজ্জালের সবচেয়ে বড় ফিতনা হলো মানুষের ঈমান নষ্ট করা। সে এমন প্রলোভন দেবে যা প্রতিহত করা কঠিন। শুধু আল্লাহর মজবুত বান্দারাই টিকতে পারবে।
দাজ্জাল কত দিন পৃথিবীতে থাকবে
দাজ্জাল চল্লিশ দিন পৃথিবীতে থাকবে। হাদিসে এ বিষয়ে স্পষ্ট বর্ণনা আছে। হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.) এই হাদিস বর্ণনা করেছেন।
প্রথম দিন হবে এক বছরের সমান। এই দিন সূর্য দেরিতে অস্ত যাবে। মনে হবে সারাদিন কেটে যাচ্ছে না। (মুসলিম শরিফ)
দ্বিতীয় দিন হবে এক মাসের সমান। এই দিনও অনেক লম্বা মনে হবে। সময় যেন থেমে যাবে।
তৃতীয় দিন হবে এক সপ্তাহের সমান। এটিও সাধারণ দিনের চেয়ে দীর্ঘ হবে। মানুষ অস্থির হয়ে পড়বে।
বাকি সাঁইত্রিশ দিন হবে স্বাভাবিক দিনের মতো। প্রতিদিন চব্বিশ ঘণ্টার হিসাবে কাটবে।
সাহাবারা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “ইয়া রাসুলুল্লাহ! প্রথম দিন যা এক বছরের সমান, সেদিন কি এক দিনের নামাজ যথেষ্ট হবে?” রাসুল (সা.) বললেন, “না, তোমরা হিসাব করে নামাজ পড়বে।” (মুসলিম)
দাজ্জালের সময়কাল:
| দিন | সময়কাল | বিশেষত্ব |
| প্রথম দিন | এক বছর | অতি দীর্ঘ |
| দ্বিতীয় দিন | এক মাস | অনেক লম্বা |
| তৃতীয় দিন | এক সপ্তাহ | দীর্ঘ |
| বাকি ৩৭ দিন | স্বাভাবিক | ২৪ ঘণ্টা করে |
এই চল্লিশ দিনে সে সারা পৃথিবী ঘুরবে। প্রতিটি জনপদে যাবে। মানুষকে পরীক্ষা করবে। কে তাকে মানে আর কে মানে না।
ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, প্রথম তিন দিন লম্বা হওয়ার কারণ। মানুষ যাতে তার ফিতনা থেকে বাঁচার সময় পায়।
চল্লিশ দিন পর হযরত ঈসা (আ.) অবতরণ করবেন। তিনি দাজ্জালকে হত্যা করবেন। এভাবে দাজ্জালের ফিতনার সমাপ্তি ঘটবে।
এই চল্লিশ দিন হবে মানবতার জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়। মুমিনদের ঈমান পরীক্ষা হবে। শুধু সত্যিকারের মুমিনরাই টিকে থাকবে।
দাজ্জাল কি অলৌকিক শক্তি পাবে
হ্যাঁ, দাজ্জাল অলৌকিক শক্তি পাবে। আল্লাহ তাকে পরীক্ষা হিসেবে বিশেষ ক্ষমতা দেবেন। এই ক্ষমতা দেখে অনেকে বিভ্রান্ত হবে।
প্রথম শক্তি হলো আকাশ ও জমিনের উপর নিয়ন্ত্রণ। সে আকাশকে বৃষ্টির আদেশ দেবে। আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে। (মুসলিম)
জমিনকে ফসল উৎপাদনের আদেশ দেবে। সাথে সাথে জমিন সবুজ হয়ে যাবে। ফসল ফলবে।
দ্বিতীয় শক্তি হলো মৃতকে জীবিত করা। একটি হাদিসে আছে, এক যুবক তাকে চ্যালেঞ্জ করবে। দাজ্জাল তাকে দুই টুকরো করবে। তারপর জীবিত করবে। (বুখারি)
কিন্তু যুবকটি দ্বিতীয়বার আরও দৃঢ় ঈমান নিয়ে বলবে। “তুমি দাজ্জাল। তোমাকে এখন আমি আরও ভালো চিনতে পেরেছি।” এরপর দাজ্জাল তাকে হত্যা করতে পারবে না।
তৃতীয় শক্তি হলো বিশাল ধন-সম্পদ। তার সাথে পাহাড়সম খাবার থাকবে। সোনা-রূপার বিশাল ভাণ্ডার থাকবে।
- আকাশ থেকে বৃষ্টি নামানো
- জমিনে ফসল ফলানো
- মৃতকে জীবিত করার দাবি
- বিশাল ধন-সম্পদের মালিক
- দ্রুত চলাচলের ক্ষমতা
- পশু-পাখি নিয়ন্ত্রণ করা
- আগুন ও পানি নিয়ন্ত্রণ
- এসব আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা
চতুর্থ শক্তি হলো দ্রুত চলাচল। মেঘের মতো দ্রুত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবে। বাতাসের বেগে ছুটবে। (মুসলিম)
পঞ্চম শক্তি হলো সম্পদের খনি বের করা। সে জমিনকে আদেশ দেবে। জমিন থেকে সম্পদ বের হবে। মানুষ তার পেছনে ছুটবে।
কিন্তু এসব শক্তি প্রকৃত অলৌকিকতা নয়। এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। মুমিনরা বুঝবে এসব শয়তানের কারসাজি।
ইমাম নববি (রহ.) বলেন, এই শক্তিগুলো দাজ্জালের নিজের নয়। আল্লাহ তাকে সাময়িকভাবে দিয়েছেন। যাতে মানুষের ঈমান পরীক্ষা হয়।
মুমিনদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো এসব দেখে বিভ্রান্ত না হওয়া। আল্লাহর উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা। এবং দাজ্জালকে প্রত্যাখ্যান করা।
দাজ্জাল কীভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করবে
দাজ্জাল অনেক উপায়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করবে। তার কৌশল হবে অত্যন্ত ধূর্ততাপূর্ণ। দুর্বল ঈমানের মানুষ সহজেই প্রতারিত হবে।
প্রথম কৌশল হলো খোদায়ির দাবি করা। সে বলবে “আমিই তোমাদের রব।” যারা আল্লাহকে ভুলে যাবে তারা বিশ্বাস করবে।
দ্বিতীয় কৌশল হলো অলৌকিক কাজ দেখানো। সাধারণ মানুষ এসব দেখে মুগ্ধ হবে। ভাববে সে সত্যিই খোদা।
তৃতীয় কৌশল হলো জান্নাত ও জাহান্নাম দেখানো। তার সাথে জান্নাতের মতো সুন্দর বাগান থাকবে। আবার জাহান্নামের মতো আগুন থাকবে। (মুসলিম)
কিন্তু হাদিসে বলা হয়েছে, তার জান্নাত হবে আসলে জাহান্নাম। আর তার জাহান্নাম হবে জান্নাত। মুমিনরা এই কৌশল বুঝবে।
চতুর্থ কৌশল হলো ধন-সম্পদের প্রলোভন। দরিদ্র মানুষকে বলবে “আমাকে মানো, আমি তোমায় ধনী করব।” অনেকে প্রলোভনে পড়বে।
পঞ্চম কৌশল হলো ভয় দেখানো। যারা মানবে না তাদের সর্বনাশ করবে। তাদের জমিন শুষ্ক করবে। পশু মেরে ফেলবে।
দাজ্জালের প্রতারণার পদ্ধতি টেবিল:
| পদ্ধতি | কৌশল | প্রভাব |
| খোদায়ির দাবি | নিজেকে রব বলা | দুর্বল ঈমানদার প্রতারিত |
| অলৌকিক কাজ | বৃষ্টি-ফসল নিয়ন্ত্রণ | সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত |
| জান্নাত-জাহান্নাম | মিথ্যা স্বর্গ-নরক দেখানো | অজ্ঞ লোক ধোঁকা খাবে |
| ধন-সম্পদ | প্রলোভন দেখানো | দরিদ্র মানুষ পতিত |
| ভয়-ভীতি | অবাধ্যদের শাস্তি | কাপুরুষরা বশীভূত |
ষষ্ঠ কৌশল হলো মিথ্যা নবুয়্যাতের দাবি। প্রথমে সে বলবে “আমি নবী।” তারপর বলবে “আমিই খোদা।”
সপ্তম কৌশল হলো যুক্তিবাদী বিভ্রান্তি। সে বলবে “তোমরা তো আমার অলৌকিক কাজ দেখছ। তাহলে কেন মানছ না?”
অষ্টম কৌশল হলো ধৈর্যহীনতা কাজে লাগানো। মানুষ যখন ক্ষুধার্ত হবে তখন খাবারের লোভ দেখাবে। দুর্বল মানুষ প্রলোভনে পড়বে।
নবম কৌশল হলো পারিবারিক চাপ। অনেক সময় পরিবারের লোকেরা দাজ্জালকে মানবে। তারা অন্যদের চাপ দেবে।
মুমিনদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো এসব কৌশল জেনে রাখা। এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখা। দাজ্জালের কোনো প্রলোভনে পড়া যাবে না।
দাজ্জাল সম্পর্কে কুরআনে কী বলা হয়েছে
কুরআনে দাজ্জাল শব্দটি সরাসরি উল্লেখ নেই। কিন্তু তার সম্পর্কে ইঙ্গিত আছে। বিভিন্ন আয়াতে কেয়ামতের আলামত বর্ণিত হয়েছে।
সুরা কাহাফে দাজ্জালের ফিতনার প্রতি ইঙ্গিত আছে। এই সুরা পড়া দাজ্জাল থেকে সুরক্ষা। হাদিসে রাসুল (সা.) এ কথা বলেছেন।
সুরা কাহাফের শুরুতে বলা হয়েছে মুমিনদের জন্য সুসংবাদ। এবং কাফেরদের জন্য সতর্কবাণী। এটি দাজ্জালের সময়ের সাথে সম্পর্কিত।
আয়াতে বলা হয়েছে, “যারা বলে আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন।” এটি খ্রিস্টান ও ইহুদিদের প্রতি ইঙ্গিত। দাজ্জাল এই সম্প্রদায় থেকে আসবে।
সুরা বাকারায় বলা হয়েছে ফিতনা হত্যার চেয়েও ভয়ানক। দাজ্জালের ফিতনা সবচেয়ে বড় ফিতনা হবে। (সুরা বাকারা: ১৯১)
সুরা নিসায় মিথ্যা দাবিদারদের সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। যারা আল্লাহর অংশীদারিত্ব দাবি করে। দাজ্জাল এমন দাবি করবে। (সুরা নিসা: ১১৬)
সুরা আনআমে বলা হয়েছে, “তারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে ডাকে।” দাজ্জালকে যারা মানবে তারা এই কাজ করবে। (সুরা আনআম: ৪০)
দাজ্জাল সম্পর্কিত কুরআনের ইঙ্গিত:
| সুরা | আয়াত | বিষয় |
| কাহাফ | ১-১০ | ফিতনা থেকে রক্ষা |
| বাকারা | ১৯১ | ফিতনার ভয়াবহতা |
| নিসা | ১১৬ | মিথ্যা দাবিদার |
| আনআম | ৪০ | আল্লাহ ছাড়া অন্যকে ডাকা |
সুরা তাকবিরে কেয়ামতের আলামত বর্ণিত আছে। এর মধ্যে দাজ্জালের আগমনও একটি। (সুরা তাকবির: ১-১৪)
ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, কুরআনে সরাসরি নাম না থাকলেও ইঙ্গিত আছে। রাসুল (সা.) হাদিসে ব্যাখ্যা করেছেন।
মুফতি তাকি উসমানি (রহ.) বলেন, সুরা কাহাফ পুরোটাই দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার উপায়। এই সুরায় চার ধরনের ফিতনার কথা আছে।
প্রথমত ধর্মীয় ফিতনা, দ্বিতীয়ত সম্পদের ফিতনা। তৃতীয়ত জ্ঞানের ফিতনা, চতুর্থত ক্ষমতার ফিতনা। দাজ্জাল এই চারটি ব্যবহার করবে।
তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত সুরা কাহাফ নিয়মিত পড়া। বিশেষ করে জুমার দিন। এটি দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষা দেবে।
দাজ্জালকে কে হত্যা করবে
দাজ্জালকে হত্যা করবেন হযরত ঈসা (আ.)। এটি হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। হযরত ঈসা (আ.) আকাশ থেকে অবতরণ করবেন।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “মারইয়াম তনয় ঈসা (আ.) অবতরণ করবেন। তিনি দাজ্জালকে হত্যা করবেন।” (বুখারি ও মুসলিম)
হযরত ঈসা (আ.) দামেস্কের পূর্বে সাদা মিনারের কাছে অবতরণ করবেন। দুই ফেরেশতার ডানার উপর তাঁর হাত থাকবে। (মুসলিম)
সে সময় ইমাম মাহদি মুসলিমদের নেতৃত্ব দেবেন। ফজরের নামাজের সময় হবে। ইমাম মাহদি ঈসা (আ.) কে ইমামতি করতে বলবেন।
কিন্তু ঈসা (আ.) বলবেন, “না, তুমিই ইমামতি কর। এটি এই উম্মতের জন্য সম্মানের বিষয়।” (মুসলিম)
নামাজ শেষে ঈসা (আ.) দাজ্জালের খোঁজে বের হবেন। ফিলিস্তিনের লুদ্দ নামক স্থানে তাঁর সাক্ষাৎ হবে।
- হযরত ঈসা (আ.) হত্যা করবেন
- দামেস্কে অবতরণ করবেন
- ফজরের সময় আগমন
- ইমাম মাহদি সাথে থাকবেন
- লুদ্দে দাজ্জালকে পাবেন
- বর্শা দিয়ে হত্যা করবেন
- দাজ্জাল গলে যাবে
- মুসলিমরা বিজয়ী হবে
হাদিসে আছে, দাজ্জাল ঈসা (আ.) কে দেখলে গলে যেতে থাকবে। লবণ পানিতে গলে যায় যেমন, তেমনি। কিন্তু ঈসা (আ.) তাকে বর্শা দিয়ে হত্যা করবেন। (মুসলিম)
দাজ্জালের রক্ত বর্শায় লাগবে। মুসলিমদের দেখাবেন যে সে মরে গেছে। সবাই খুশিতে তাকবির ধ্বনি দেবে।
দাজ্জালের অনুসারীরা পালিয়ে যাবে। কিন্তু তারা লুকাতে পারবে না। গাছ ও পাথর পর্যন্ত মুসলিমদের বলবে। “এই পাথরের পেছনে ইহুদি লুকিয়ে আছে।” (বুখারি)
এভাবে দাজ্জালের ফিতনার সমাপ্তি ঘটবে। মুসলিমরা শান্তিতে বসবাস করবে। হযরত ঈসা (আ.) ৪০ বছর পৃথিবীতে থাকবেন।
এই সময়কে বলা হয় স্বর্ণযুগ। পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করবে। কোনো অন্যায়-অবিচার থাকবে না। সবাই আল্লাহর দীনে থাকবে।
ঈসা (আ.) এর মৃত্যুর পর তাঁকে মদিনায় রাসুল (সা.) এর কবরের পাশে দাফন করা হবে। এই স্থান ইতিমধ্যে সংরক্ষিত আছে।
ঈসা (আ.) ও দাজ্জাল
হযরত ঈসা (আ.) এবং দাজ্জালের সম্পর্ক গভীর। দাজ্জালকে হত্যার জন্যই ঈসা (আ.) পুনরায় আসবেন। এটি কেয়ামতের বড় আলামত।
ঈসা (আ.) দ্বিতীয়বার আগমন করবেন নবী হিসেবে নয়। বরং মুহাম্মাদ (সা.) এর উম্মত হিসেবে। ইসলামের শরিয়ত অনুসরণ করবেন।
হাদিসে আছে, ঈসা (আ.) দামেস্কের পূর্বে হলুদ রঙের দুটি কাপড় পরে অবতরণ করবেন। তাঁর চুল ভেজা থাকবে। (মুসলিম)
দুজন ফেরেশতা তাঁকে ধারণ করে রাখবেন। মানুষ তাঁকে দেখে চিনতে পারবে। মুসলিমরা আনন্দিত হবে।
সে সময় ইমাম মাহদি মুসলিমদের নেতৃত্ব দেবেন। ঈসা (আ.) তাঁর সাথে দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন।
দাজ্জাল ঈসা (আ.) এর শ্বাস পেলেই মরে যাবে। ঈসা (আ.) এর শ্বাস যত দূর যাবে দাজ্জাল তত দূর পালাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরা পড়বে। (মুসলিম)
ঈসা (আ.) ও দাজ্জাল:
| বিষয় | ঈসা (আ.) | দাজ্জাল |
| পরিচয় | আল্লাহর নবী | শয়তানের সেবক |
| আগমন | আকাশ থেকে | জমিন থেকে |
| উদ্দেশ্য | হিদায়াত দেওয়া | বিভ্রান্ত করা |
| অনুসারী | মুমিনরা | কাফেররা |
| পরিণতি | বিজয় | পরাজয় ও মৃত্যু |
ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যার পর ক্রুশ ভাঙবেন। শূকর হত্যা করবেন। জিযিয়া কর বাতিল করবেন। (বুখারি)
এর অর্থ হলো, খ্রিস্টানরা বুঝবে ঈসা (আ.) খোদা ছিলেন না। ক্রুশের কোনো মূল্য নেই। জিযিয়া না নিয়ে সবাইকে ইসলামে আসতে বলবেন।
হযরত ঈসা (আ.) চল্লিশ বছর পৃথিবীতে থাকবেন। এই সময় পৃথিবীতে শান্তি ও সমৃদ্ধি আসবে। কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ থাকবে না।
ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ঈসা (আ.) এবং দাজ্জাল সত্য ও মিথ্যার প্রতীক। সত্য বিজয়ী হবে। মিথ্যা পরাজিত হবে।
ঈসা (আ.) এর আগমন মুসলিমদের জন্য বিশাল সুসংবাদ। দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্তি পাবে। এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে।
মুসলিমদের উচিত ঈসা (আ.) এর আগমনের জন্য দোয়া করা। এবং দাজ্জালের ফিতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া।
ইমাম মাহদি ও দাজ্জাল
ইমাম মাহদি এবং দাজ্জালের মধ্যে সংঘর্ষ হবে। ইমাম মাহদি আসবেন দাজ্জালের আগে। তিনি মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করবেন।
হাদিসে বলা হয়েছে, ইমাম মাহদি রাসুল (সা.) এর বংশধর হবেন। তাঁর নাম হবে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ। (আবু দাউদ)
তিনি মক্কায় আবির্ভূত হবেন। কাবার কাছে বাইআত গ্রহণ করবেন। মুসলিমরা তাঁকে খলিফা মানবে।
ইমাম মাহদির সময় পৃথিবীতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। জুলুম-অত্যাচার দূর হবে। মানুষ শান্তিতে বসবাস করবে।
কিন্তু এই সময়ই দাজ্জাল বের হবে। সে দেখবে মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ। একজন শক্তিশালী নেতার অধীনে আছে।
দাজ্জাল মুসলিমদের আক্রমণ করবে। কিন্তু ইমাম মাহদি তার বিরুদ্ধে লড়াই করবেন। মুসলিমদের নেতৃত্ব দেবেন।
- ইমাম মাহদি দাজ্জালের আগে আসবেন
- রাসুল (সা.) এর বংশধর হবেন
- মক্কায় বাইআত নেবেন
- ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন
- দাজ্জালের বিরুদ্ধে লড়বেন
- মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করবেন
- ঈসা (আ.) এর সাথে থাকবেন
- বিজয় অর্জন করবেন
যখন দাজ্জাল শক্তিশালী হবে তখন ঈসা (আ.) অবতরণ করবেন। ইমাম মাহদি তাঁকে ইমামতি করতে বলবেন। কিন্তু ঈসা (আ.) ইমাম মাহদিকে সম্মান দেবেন।
হাদিসে আছে, ঈসা (আ.) ইমাম মাহদির পেছনে নামাজ পড়বেন। এটি এই উম্মতের জন্য সম্মানের। (মুসলিম)
নামাজ শেষে তাঁরা একসাথে দাজ্জালের বিরুদ্ধে যাবেন। ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন। ইমাম মাহদি মুসলিমদের নেতৃত্ব দেবেন।
দাজ্জালের মৃত্যুর পর ইমাম মাহদি এবং ঈসা (আ.) একসাথে কাজ করবেন। পৃথিবীতে ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে।
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ইমাম মাহদি হবেন রাজনৈতিক নেতা। আর ঈসা (আ.) হবেন ধর্মীয় নেতা। তাঁরা একসাথে কাজ করবেন।
মুসলিমদের উচিত ইমাম মাহদির আগমনের জন্য প্রস্তুত থাকা। এবং দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার চেষ্টা করা। আল্লাহর সাহায্য চাওয়া।
দাজ্জাল ইয়াজুজ মাজুজ সম্পর্ক
দাজ্জাল এবং ইয়াজুজ মাজুজ কেয়ামতের বড় আলামত। তবে তারা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আসবে। প্রথমে দাজ্জাল, তারপর ইয়াজুজ মাজুজ।
দাজ্জাল হবে একজন মানুষ। কিন্তু ইয়াজুজ মাজুজ হবে এক বিশাল জাতি। তাদের সংখ্যা হবে অসংখ্য।
হাদিসে আছে, প্রতি হাজার মানুষের মধ্যে নয়শত নিরানব্বই জন ইয়াজুজ মাজুজ থেকে হবে। (বুখারি)
দাজ্জালকে ঈসা (আ.) হত্যা করবেন। এরপর ইয়াজুজ মাজুজ বের হবে। তারা পৃথিবীতে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে।
ইয়াজুজ মাজুজ ইয়াকুব (আ.) এর বংশধর। তারা দীর্ঘদিন যুলকারনাইনের তৈরি দেয়ালের পেছনে বন্দি আছে। (সুরা কাহাফ: ৯৪-৯৬)
যখন আল্লাহর নির্দেশ হবে তখন সেই দেয়াল ভেঙে যাবে। তারা বের হয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে।
দাজ্জাল ও ইয়াজুজ মাজুজ তুলনা:
| বিষয় | দাজ্জাল | ইয়াজুজ মাজুজ |
| সংখ্যা | একজন | বিশাল জাতি |
| আগমন | প্রথমে | পরে |
| উৎস | ইহুদি বংশ | ইয়াকুব (আ.) বংশ |
| মৃত্যু | ঈসা (আ.) হত্যা | আল্লাহর আজাব |
| সময়কাল | ৪০ দিন | কিছু বছর |
ইয়াজুজ মাজুজ এত শক্তিশালী হবে যে মুসলিমরা তাদের সামনে দাঁড়াতে পারবে না। ঈসা (আ.) মুসলিমদের নিয়ে তুর পাহাড়ে আশ্রয় নেবেন। (মুসলিম)
সেখানে তাঁরা আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন। আল্লাহ ইয়াজুজ মাজুজের ঘাড়ে কীট পাঠাবেন। সবাই একসাথে মরে যাবে। (মুসলিম)
তাদের লাশে পৃথিবী ভরে যাবে। দুর্গন্ধ ছড়াবে। তারপর আল্লাহ বৃষ্টি পাঠাবেন। সব লাশ সমুদ্রে ভেসে যাবে।
এভাবে দাজ্জাল এবং ইয়াজুজ মাজুজ উভয়ের ফিতনা শেষ হবে। পৃথিবীতে শান্তি ফিরে আসবে।
- দুটি ভিন্ন ফিতনা
- দাজ্জাল আগে, ইয়াজুজ মাজুজ পরে
- দাজ্জাল একজন, ইয়াজুজ মাজুজ জাতি
- ঈসা (আ.) দুটোর সময়ই থাকবেন
- আল্লাহ উভয়কে ধ্বংস করবেন
- মুমিনরা বিজয়ী হবে
- শান্তি ফিরে আসবে
- কেয়ামতের বড় আলামত
ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, দাজ্জাল এবং ইয়াজুজ মাজুজ দুটি ভিন্ন পরীক্ষা। একটি ধর্মীয় প্রতারণা। অন্যটি শারীরিক শক্তি।
মুসলিমদের উচিত উভয় ফিতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া। ঈমান মজবুত রাখা। এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা।
দাজ্জালের সময় মুসলমানদের করণীয়
দাজ্জালের সময় মুসলমানদের জন্য হবে কঠিন পরীক্ষা। সে সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় আছে। যা মেনে চললে বাঁচা সম্ভব।
প্রথম করণীয় হলো দাজ্জাল থেকে দূরে থাকা। রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে দাজ্জালের কথা শুনবে সে যেন তার কাছ থেকে দূরে থাকে।” (আবু দাউদ)
কারণ অনেকে মনে করবে আমি ঈমানদার তাই প্রতারিত হব না। কিন্তু তার ফিতনা এতই শক্তিশালী যে অনেকে পড়ে যাবে।
দ্বিতীয় করণীয় হলো মক্কা বা মদিনায় আশ্রয় নেওয়া। দাজ্জাল এই দুই শহরে প্রবেশ করতে পারবে না। ফেরেশতারা পাহারা দেবেন। (বুখারি ও মুসলিম)
তৃতীয় করণীয় হলো পাহাড়ে বা দুর্গম স্থানে লুকিয়ে থাকা। হাদিসে বলা হয়েছে মানুষ পাহাড়ে পালিয়ে যাবে। (মুসলিম)
চতুর্থ করণীয় হলো সুরা কাহাফ মুখস্থ করা। বিশেষ করে প্রথম দশ আয়াত। এটি দাজ্জাল থেকে সুরক্ষা দেবে। (মুসলিম)
পঞ্চম করণীয় হলো নিয়মিত দোয়া পড়া। “আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন আজাবিল কবরি ওয়া মিন ফিতনাতিল মাসিহিদ দাজ্জাল।” (বুখারি)
দাজ্জালের সময় মুসলিমদের করণীয় তালিকা:
| ক্রমিক | করণীয় | উপকারিতা |
| ১ | দূরে থাকা | প্রতারণা থেকে রক্ষা |
| ২ | মক্কা-মদিনায় যাওয়া | নিরাপদ আশ্রয় |
| ৩ | পাহাড়ে লুকানো | শারীরিক সুরক্ষা |
| ৪ | সুরা কাহাফ পড়া | আধ্যাত্মিক সুরক্ষা |
| ৫ | দোয়া করা | আল্লাহর সাহায্য |
ষষ্ঠ করণীয় হলো ঈমান মজবুত রাখা। দুনিয়ার প্রলোভনে পড়া যাবে না। আখেরাতকে প্রাধান্য দিতে হবে।
সপ্তম করণীয় হলো ধৈর্য ধারণ করা। কষ্ট আসবে কিন্তু ধৈর্য ধরতে হবে। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।
অষ্টম করণীয় হলো একে অপরকে সাহায্য করা। মুসলিমরা একতাবদ্ধ থাকবে। একে অপরের পাশে দাঁড়াবে।
নবম করণীয় হলো কুরআন-হাদিসের জ্ঞান অর্জন করা। যারা জ্ঞানী তারা সহজে প্রতারিত হবে না।
দশম করণীয় হলো নেক আমল বৃদ্ধি করা। নামাজ, রোজা, সদকা সবকিছু বাড়াতে হবে। এগুলো ঢাল হয়ে রক্ষা করবে।
- দাজ্জাল থেকে দূরে থাকা
- মক্কা-মদিনায় আশ্রয় নেওয়া
- পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা
- সুরা কাহাফ মুখস্থ করা
- নিয়মিত দোয়া পড়া
- ঈমান মজবুত রাখা
- ধৈর্য ধারণ করা
- নেক আমল বৃদ্ধি করা
ইমাম নববি (রহ.) বলেন, দাজ্জালের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আল্লাহর উপর ভরসা। যে আল্লাহকে আঁকড়ে ধরবে সে রক্ষা পাবে।
মুসলিমদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। ঈমান মজবুত করা। কুরআন-হাদিস শেখা। এবং নেক আমল করা। যাতে সে সময় টিকে থাকা যায়।
দাজ্জাল থেকে বাঁচার দোয়া
দাজ্জাল থেকে বাঁচার জন্য বিশেষ দোয়া আছে। রাসুল (সা.) নিজে এই দোয়া পড়তেন। এবং সাহাবাদের শিখিয়েছেন।
প্রধান দোয়া হলো: “আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন আজাবিল কাবরি, ওয়া আজাবি জাহান্নামা, ওয়া ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাত, ওয়া ফিতনাতিল মাসিহিদ দাজ্জাল।” (বুখারি ও মুসলিম)
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে কবরের আজাব থেকে, জাহান্নামের আজাব থেকে, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে এবং দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই।”
এই দোয়া প্রতিটি নামাজের শেষ বৈঠকে পড়া সুন্নত। তাশাহহুদের পর দরুদের আগে পড়তে হয়।
আরেকটি দোয়া হলো: “আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন ফিতনাতিদ দাজ্জাল।” অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি দাজ্জালের ফিতনা থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই।”
হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) প্রতিদিন এই দোয়া পড়তেন। তিনি উম্মতকেও পড়তে বলেছেন। (মুসলিম)
সকাল-সন্ধ্যার দোয়াতেও দাজ্জাল থেকে আশ্রয় চাওয়া আছে। আয়াতুল কুরসি পড়লেও সুরক্ষা পাওয়া যায়।
দাজ্জাল থেকে বাঁচার দোয়া সমূহ:
| সময় | দোয়া | উপকার |
| নামাজে | তাশাহহুদের পর | নিয়মিত সুরক্ষা |
| সকাল-সন্ধ্যা | আশ্রয়ের দোয়া | দৈনিক হেফাজত |
| ঘুমের আগে | আয়াতুল কুরসি | রাতের সুরক্ষা |
| যেকোনো সময় | ফিতনার দোয়া | সার্বক্ষণিক রক্ষা |
সুরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে সুরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করবে সে দাজ্জাল থেকে রক্ষা পাবে।” (মুসলিম)
প্রতি জুমার দিন সুরা কাহাফ পড়া সুন্নত। এটি সারা সপ্তাহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষা দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া হলো: “রব্বানা লা তুযিগ কুলুবানা বা’দা ইয হাদাইতানা ওয়া হাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমাহ।” (সুরা আলে ইমরান: ৮)
অর্থ: “হে আমাদের রব! হেদায়াত দেওয়ার পর আমাদের অন্তর বাঁকা করো না। তোমার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান কর।”
এই দোয়া ঈমান রক্ষার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। দাজ্জালের ফিতনা থেকে ঈমান রক্ষা পায়।
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, নিয়মিত দোয়া পড়া এবং নেক আমল করা দাজ্জাল থেকে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
দাজ্জাল ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়
দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়ার অনেক উপায় আছে। হাদিসে এগুলো স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। মুমিনদের এসব মেনে চলা উচিত।
প্রথম উপায় হলো ঈমান মজবুত করা। যার ঈমান শক্তিশালী সে প্রতারিত হবে না। আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে হবে।
দ্বিতীয় উপায় হলো কুরআন নিয়মিত তেলাওয়াত করা। কুরআন হৃদয়ে নূর সৃষ্টি করে। অন্ধকার দূর করে।
তৃতীয় উপায় হলো হাদিস অধ্যয়ন করা। দাজ্জাল সম্পর্কে হাদিস পড়লে তাকে চেনা সহজ হয়। প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
চতুর্থ উপায় হলো নেক আমল বৃদ্ধি করা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত পড়া। রোজা রাখা। যাকাত দেওয়া। হজ্জ করা।
পঞ্চম উপায় হলো পাপ থেকে বিরত থাকা। পাপ ঈমান দুর্বল করে। যার ঈমান দুর্বল সে সহজে বিভ্রান্ত হয়।
ষষ্ঠ উপায় হলো নেককার মানুষের সাথে থাকা। “মানুষ তার বন্ধুর ধর্মে থাকে।” নেককাররা সঠিক পথ দেখায়।
- ঈমান মজবুত করা
- কুরআন নিয়মিত পড়া
- হাদিস অধ্যয়ন করা
- নেক আমল বাড়ানো
- পাপ থেকে বিরত থাকা
- নেককাদের সাথী হওয়া
- নিয়মিত দোয়া করা
- তাওবা করা
সপ্তম উপায় হলো দুনিয়ার মোহ কমানো। দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা বিপজ্জনক। আখেরাতকে প্রাধান্য দিতে হবে।
অষ্টম উপায় হলো সবর বা ধৈর্য অর্জন করা। দাজ্জালের সময় অনেক কষ্ট আসবে। ধৈর্য ছাড়া টিকে থাকা কঠিন।
নবম উপায় হলো আল্লাহর জিকির করা। “আল্লাহর জিকিরে অন্তর শান্তি পায়।” (সুরা রাদ: ২৮) জিকির অন্তরকে শক্তিশালী করে।
দশম উপায় হলো ইলম অর্জন করা। জ্ঞানী মানুষ সহজে প্রতারিত হয় না। তারা সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করতে পারে।
একাদশ উপায় হলো তাওবা করা। পূর্বের পাপ থেকে তাওবা করতে হবে। নতুন করে শুরু করতে হবে।
দ্বাদশ উপায় হলো দাওয়াতি কাজ করা। অন্যদের সতর্ক করা। পরিবার ও বন্ধুদের বলা দাজ্জাল সম্পর্কে।
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন, দাজ্জাল থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় উপায় হলো আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত করা। যে আল্লাহর কাছাকাছি সে নিরাপদ।
দাজ্জাল সম্পর্কে সহিহ হাদিস
দাজ্জাল সম্পর্কে অনেক সহিহ হাদিস আছে। বুখারি ও মুসলিম শরিফে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ হাদিস তুলে ধরা হলো।
হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, “কোনো নবী নেই যিনি তার উম্মতকে এক চোখওয়ালা মিথ্যাবাদী সম্পর্কে সতর্ক করেননি। সে এক চোখওয়ালা আর তোমাদের রব এক চোখওয়ালা নন।” (বুখারি: ৭১২৩)
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, “দাজ্জাল বের হবে। একজন মুমিন তার কাছে যাবে। তখন সশস্ত্র প্রহরীরা বলবে, কোথায় যাচ্ছ? মুমিন বলবে, এই লোকটির কাছে যিনি বের হয়েছেন। প্রহরীরা বলবে, তুমি কি আমাদের রবকে চেনো না? মুমিন বলবে, আমার রব সকলেরই রব।” (মুসলিম: ২৯৩৭)
হযরত হুজায়ফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, “দাজ্জাল তার বাম চোখে অন্ধ। তার মাথার চুল খুব বেশি। তার সাথে জান্নাত ও জাহান্নাম থাকবে। কিন্তু তার জাহান্নাম হবে জান্নাত আর জান্নাত হবে জাহান্নাম।” (বুখারি: ৭১২৪, মুসলিম: ২৯৩৪)
নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.) বর্ণনা করেন, “দাজ্জাল চল্লিশ দিন থাকবে। এক দিন এক বছরের সমান, এক দিন এক মাসের সমান, এক দিন এক সপ্তাহের সমান এবং বাকি দিনগুলো স্বাভাবিক।” (মুসলিম: ২৯৩৭)
উম্মে শারিক (রা.) থেকে বর্ণিত, “আরবরা দাজ্জালের ভয়ে পাহাড়ে পালিয়ে যাবে।” (মুসলিম: ২৯৪৫)
প্রধান সহিহ হাদিসের তালিকা:
| হাদিস | বর্ণনাকারী | বিষয় |
| বুখারি ৭১২৩ | আনাস (রা.) | এক চোখ অন্ধ |
| মুসলিম ২৯৩৭ | নাওয়াস (রা.) | ৪০ দিন থাকবে |
| বুখারি ৭১২৪ | হুজায়ফা (রা.) | জান্নাত-জাহান্নাম |
| মুসলিম ২৯৪৫ | উম্মে শারিক (রা.) | পাহাড়ে পালানো |
ফাতিমা বিনতে কায়েস (রা.) থেকে দীর্ঘ হাদিস বর্ণিত। তামিম দারি (রা.) এর সমুদ্রযাত্রার ঘটনা। জাসসাসা এবং দাজ্জালের সাক্ষাৎ। এই হাদিস মুসলিম শরিফে আছে। (মুসলিম: ২৯৪২)
ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, “একদিন রাসুল (সা.) মানুষের মাঝে দাঁড়ালেন। আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা করলেন। তারপর দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করলেন। বললেন, আমি তোমাদের সতর্ক করছি তার সম্পর্কে।” (বুখারি: ৭১২৭)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, “তিনটি বিষয় প্রকাশ পেলে ঈমান আনা কাজে আসবে না যদি পূর্বে ঈমান না এনে থাকে। দাজ্জাল তার একটি।” (মুসলিম: ১৫৮)
মুগিরা ইবনে শুবা (রা.) বর্ণনা করেন, “দাজ্জাল সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি কেউ জিজ্ঞাসা করেনি।” (বুখারি: ৭১২২)
এসব সহিহ হাদিস থেকে দাজ্জাল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। মুসলিমদের এসব হাদিস পড়া এবং মেনে চলা উচিত।
- বুখারিতে অনেক সহিহ হাদিস
- মুসলিম শরিফে বিস্তারিত বর্ণনা
- সাহাবারা সরাসরি বর্ণনা করেছেন
- রাসুল (সা.) বারবার সতর্ক করেছেন
- প্রতিটি খুতবায় উল্লেখ করতেন
- তামিম দারি (রা.) দেখেছিলেন
- স্পষ্ট চিহ্ন বর্ণিত হয়েছে
- মুমিনদের জন্য দিকনির্দেশনা
দাজ্জালের মৃত্যুর পর কী হবে
দাজ্জালের মৃত্যুর পর পৃথিবীতে শান্তি ফিরে আসবে। হযরত ঈসা (আ.) তাকে হত্যা করবেন। তারপর দীর্ঘ সময় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।
দাজ্জাল মারা গেলে তার সব অনুসারী পালিয়ে যাবে। কিন্তু তারা লুকাতে পারবে না। গাছ ও পাথর মুসলিমদের জানাবে। (বুখারি)
তারপর হযরত ঈসা (আ.) এবং ইমাম মাহদি মিলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন। পৃথিবীতে ইসলামি শাসন কায়েম হবে।
ঈসা (আ.) ক্রুশ ভাঙবেন। শূকর হত্যা করবেন। জিযিয়া কর বাতিল করবেন। অর্থাৎ সবাই ইসলামে আসবে। (বুখারি)
পৃথিবীতে এতটাই শান্তি হবে যে সিংহ ও গরু একসাথে ঘাস খাবে। শিশুরা সাপের সাথে খেলবে। কোনো ভয় থাকবে না। (মুসনাদে আহমাদ)
সম্পদের এতটা প্রাচুর্য হবে যে কেউ যাকাত নিতে চাইবে না। মানুষ বলবে আমার প্রয়োজন নেই। (বুখারি ও মুসলিম)
হাদিসে আছে এক গুচ্ছ আঙুর পঞ্চাশজন মানুষের খাবার হবে। এক ডালিম তিরিশজনের খাবার হবে। (মুসলিম)
দাজ্জালের মৃত্যু পরবর্তী সময়:
| সময়কাল | ঘটনা | ফলাফল |
| প্রথম পর্যায় | দাজ্জাল হত্যা | অনুসারীরা পালাবে |
| দ্বিতীয় পর্যায় | শান্তি স্থাপন | ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা |
| তৃতীয় পর্যায় | ঈসা (আ.) এর শাসন | ইসলামি খেলাফত |
| চতুর্থ পর্যায় | সমৃদ্ধির যুগ | সবার জন্য কল্যাণ |
কিন্তু এই শান্তি চিরস্থায়ী হবে না। কিছু বছর পর ইয়াজুজ মাজুজ বের হবে। তারা আবার ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে।
ঈসা (আ.) এবং মুমিনরা তুর পাহাড়ে আশ্রয় নেবেন। আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন। আল্লাহ ইয়াজুজ মাজুজকে ধ্বংস করবেন। (মুসলিম)
তারপর আবার শান্তি ফিরবে। ঈসা (আ.) চল্লিশ বছর পৃথিবীতে থাকবেন। এই সময়কে বলা হয় স্বর্ণযুগ।
ঈসা (আ.) এর মৃত্যুর পর তাঁকে মদিনায় রাসুল (সা.) এর পাশে দাফন করা হবে। মদিনার মসজিদে নববিতে এই স্থান সংরক্ষিত আছে।
এরপর ধীরে ধীরে মানুষের ঈমান কমতে থাকবে। আবার জুলুম-অত্যাচার বাড়বে। শেষ পর্যন্ত কেয়ামত এসে যাবে।
কিন্তু দাজ্জালের মৃত্যুর পরবর্তী সময়টা হবে মুমিনদের জন্য সুখের। তারা শান্তিতে ইবাদত করতে পারবে। কোনো ফিতনা থাকবে না।
- দাজ্জাল মৃত্যুর পর শান্তি
- ঈসা (আ.) শাসন করবেন
- ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠা
- সম্পদের প্রাচুর্য হবে
- কোনো যুদ্ধ থাকবে না
- ন্যায়বিচার সর্বত্র
- ইয়াজুজ মাজুজ পরে আসবে
- স্বর্ণযুগ চল্লিশ বছর
দাজ্জাল কি এখনো জীবিত
হ্যাঁ, দাজ্জাল এখনো জীবিত আছে। তামিম দারি (রা.) বর্ণিত হাদিস থেকে এটি প্রমাণিত। সে একটি দ্বীপে শিকলে বাঁধা আছে।
রাসুল (সা.) এর যুগেই দাজ্জাল জীবিত ছিল। তামিম দারি (রা.) এবং তার সাথীরা তাকে দেখেছিলেন। রাসুল (সা.) এই ঘটনা সত্য বলে নিশ্চিত করেছেন। (মুসলিম শরিফ)
এর অর্থ হলো দাজ্জাল প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে জীবিত আছে। আল্লাহ তাকে দীর্ঘ জীবন দিয়েছেন ফিতনা হিসেবে।
ঠিক যেমন ইবলিস শয়তানকে কেয়ামত পর্যন্ত জীবিত রাখা হয়েছে। দাজ্জালকেও তার নির্ধারিত সময় পর্যন্ত রাখা হয়েছে।
সে এখন একটি দ্বীপে বন্দি আছে। শিকলে বাঁধা অবস্থায় আছে। জাসসাসা নামক এক প্রাণী তাকে পাহারা দিচ্ছে।
দাজ্জাল সেখানে বসে পৃথিবীর খবর নেয়। জাসসাসা তাকে খবর দেয়। সে অপেক্ষা করছে মুক্তির জন্য।
যখন আল্লাহর নির্দেশ হবে তখন সে মুক্ত হবে। তার শিকল ভেঙে যাবে। তারপর সে বের হয়ে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে।
দাজ্জালের বর্তমান অবস্থা:
| প্রশ্ন | উত্তর |
| জীবিত কি? | হ্যাঁ |
| কোথায়? | পূর্বের এক দ্বীপে |
| কত বছর? | প্রায় ১৫০০ বছর |
| মুক্ত হবে কখন? | আল্লাহর হুকুমে |
অনেকে প্রশ্ন করেন মানুষ কীভাবে এত দিন বাঁচে? উত্তর হলো আল্লাহর ইচ্ছায় সম্ভব। হযরত নূহ (আ.) সাড়ে নয়শ বছর বেঁচেছিলেন।
ইবলিস শয়তান হাজার হাজার বছর ধরে জীবিত আছে। কেয়ামত পর্যন্ত বাঁচবে। আল্লাহর কুদরতে সবকিছু সম্ভব।
দাজ্জালকে এতদিন বাঁচিয়ে রাখার উদ্দেশ্য হলো মানুষের পরীক্ষা। সে বের হয়ে মানুষকে পরীক্ষা করবে। কে সত্য মানে আর কে মিথ্যা মানে।
ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, দাজ্জাল জীবিত আছে এটি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
মুসলিমদের এই বিশ্বাস রাখা উচিত যে দাজ্জাল এখনো জীবিত। এবং শিগগিরই সে বের হবে। তাই এখন থেকেই প্রস্তুত থাকা জরুরি।
দাজ্জাল কোন যুগে আসবে
দাজ্জাল শেষ যুগে আসবে। কেয়ামতের খুব কাছাকাছি সময়ে। এটি কেয়ামতের বড় দশটি আলামতের একটি।
রাসুল (সা.) বলেছেন কেয়ামতের আগে দশটি বড় নিদর্শন প্রকাশ পাবে। দাজ্জাল তার মধ্যে একটি। (মুসলিম)
বর্তমান যুগকে অনেকে শেষ যুগ বলে মনে করেন। কারণ কেয়ামতের অনেক ছোট আলামত প্রকাশ পেয়েছে।
হাদিসে বলাহয়েছে নবীজি (সা.) এর পরে আর কোনো নবী আসবেন না। শুধু দাজ্জাল এবং ঈসা (আ.) আসবেন।
দাজ্জাল এমন সময় আসবে যখন মানুষ দুনিয়ার পেছনে পাগল হয়ে যাবে। ধর্মহীনতা বাড়বে। অন্যায়-অবিচার ছড়িয়ে পড়বে।
যখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে যাবে তখন দাজ্জাল আসবে। মসজিদগুলো শূন্য হয়ে যাবে। আর ব্যবসা-বাজার ভরে যাবে।
- শেষ যুগে আসবে
- কেয়ামতের খুব কাছে
- ধর্মহীনতার সময়
- জুলুমের প্রসারকালে
- বস্তুবাদের যুগে
- ইমাম মাহদির পরে
- ঈসা (আ.) এর আগে
- বর্তমান যুগের কাছাকাছি
যখন মানুষ সম্পদ নিয়ে গর্ব করবে তখন আসবে। বড় বড় ইমারত তৈরি হবে। দরিদ্র মানুষ নেতা হবে। এসব দেখা যাচ্ছে এখন।
যখন জ্ঞান উঠে যাবে এবং মূর্খতা বাড়বে তখন আসবে। মানুষ কুরআন-হাদিস ভুলে যাবে। এসবও হচ্ছে আজকাল।
যখন নারী-পুরুষের পার্থক্য মুছে যাবে তখন আসবে। নারীরা পুরুষের পোশাক পরবে। পুরুষরা নারীর পোশাক পরবে। এটাও দেখা যাচ্ছে।
যখন মানুষ লজ্জাশীলতা হারাবে তখন আসবে। অশ্লীলতা প্রকাশ্যে হবে। এবং মানুষ এতে গর্ববোধ করবে।
ইমাম ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, দাজ্জালের আগমনের সময় নিকটবর্তী। কেয়ামতের অধিকাংশ ছোট আলামত পূরণ হয়ে গেছে।
মুসলিমদের সতর্ক থাকা উচিত। যেকোনো সময় দাজ্জাল আসতে পারে। তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
দাজ্জাল নিয়ে ইসলামের ব্যাখ্যা
ইসলামে দাজ্জাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি ঈমানের অংশ। প্রতিটি মুসলমানের বিশ্বাস করা উচিত দাজ্জাল আসবে।
দাজ্জাল মানে প্রতারক। যে সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে দেয়। ইসলাম তাকে সবচেয়ে বড় ফিতনা বলে আখ্যায়িত করেছে।
প্রতিটি নবী তাদের উম্মতকে দাজ্জাল থেকে সতর্ক করেছেন। এটি প্রমাণ করে এই ফিতনা কতটা গুরুতর। মুসলিমদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।
দাজ্জালের আগমন কেয়ামতের আলামত। এটি ঘটবেই। কেউ ঠেকাতে পারবে না। তবে মুমিনরা তার ফিতনা থেকে বাঁচবে।
ইসলাম শিক্ষা দেয় দাজ্জাল থেকে বাঁচার উপায়। কুরআন, হাদিস, দোয়া এবং নেক আমলের মাধ্যমে বাঁচা সম্ভব।
দাজ্জালকে মানুষের পরীক্ষা হিসেবে পাঠানো হবে। যার ঈমান দুর্বল সে পড়ে যাবে। যার ঈমান শক্তিশালী সে টিকে থাকবে।
ইসলামের দৃষ্টিতে দাজ্জাল:
| বিষয় | ব্যাখ্যা |
| পরিচয় | সবচেয়ে বড় প্রতারক |
| উদ্দেশ্য | মানুষের পরীক্ষা |
| আগমন | কেয়ামতের আলামত |
| পরাজয় | ঈসা (আ.) হত্যা করবেন |
ইসলাম বলে দাজ্জালের অলৌকিক শক্তি প্রকৃত নয়। এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। বুদ্ধিমান মুমিন এসব দেখে বিভ্রান্ত হবে না।
দাজ্জাল নিজেকে খোদা দাবি করবে। কিন্তু আল্লাহ তাকে ত্রুটিপূর্ণ বানিয়েছেন। তার এক চোখ অন্ধ। কপালে ‘কাফির’ লেখা।
মুমিনরা এসব চিহ্ন দেখে তাকে চিনবে। এবং তার দাবি প্রত্যাখ্যান করবে। যত কষ্ট আসুক ঈমান ছাড়বে না।
ইসলাম শেখায় দাজ্জালের জান্নাত আসলে জাহান্নাম। আর তার জাহান্নাম আসলে জান্নাত। মুমিনরা এই সত্য জানবে।
যারা দুনিয়ার প্রলোভনে পড়ে তাকে মানবে তারা আখেরাতে জাহান্নামে যাবে। যারা কষ্ট সহ্য করে টিকে থাকবে তারা জান্নাতে যাবে।
ইমাম নববি (রহ.) বলেন, দাজ্জাল বিষয়ে ঈমান রাখা ফরজ। যে অস্বীকার করবে সে কাফের হবে। কারণ সহিহ হাদিসে স্পষ্ট আছে।
ইসলাম আরও শেখায় দাজ্জাল চিরকাল থাকবে না। মাত্র চল্লিশ দিন থাকবে। তারপর ঈসা (আ.) তাকে হত্যা করবেন। মিথ্যার পরাজয় হবে।
দাজ্জাল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা
দাজ্জাল সম্পর্কে বিস্তারিত জানা প্রতিটি মুসলমানের জন্য জরুরি। কারণ এটি ঈমানের পরীক্ষা। সঠিক জ্ঞান থাকলে বাঁচা সহজ হবে।
দাজ্জাল হবে এক চোখবিশিষ্ট। ডান চোখ অন্ধ থাকবে। কপালে ‘কাফির’ লেখা থাকবে। যা প্রতিটি মুমিন পড়তে পারবে।
তার উচ্চতা হবে লম্বা। শরীর মোটা। চুল ঘন এবং কোঁকড়ানো। দেখতে ভয়ংকর লাগবে। কিন্তু অনেকে প্রতারিত হবে।
সে ইসফাহান থেকে বের হবে। সাথে সত্তর হাজার ইহুদি থাকবে। তারা সবাই চওড়া শাল পরবে। (মুসলিম)
প্রথমে সে নবুয়্যাতের দাবি করবে। কিছু মানুষ বিভ্রান্ত হবে। তারপর খোদায়ির দাবি করবে। আরও অনেকে বিভ্রান্ত হবে।
তার সাথে অলৌকিক শক্তি থাকবে। আকাশ থেকে বৃষ্টি নামাবে। জমিন থেকে ফসল বের করবে। মৃতকে জীবিত করার দাবি করবে।
দাজ্জালের বিস্তারিত বিবরণ:
| বৈশিষ্ট্য | বিস্তারিত তথ্য |
| চেহারা | লাল বর্ণ, এক চোখ অন্ধ, মোটা |
| উৎস | ইহুদি বংশ, ইসফাহান |
| সময়কাল | ৪০ দিন |
| শক্তি | অলৌকিক ক্ষমতা |
| অনুসারী | ইহুদি, কাফের, মুনাফিক |
| মৃত্যু | ঈসা (আ.) হত্যা করবেন |
সে দ্রুত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবে। মেঘের গতিতে ছুটবে। সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াবে। শুধু মক্কা ও মদিনা বাদে।
তার সাথে থাকবে জান্নাত ও জাহান্নামের মতো দুটি বিষয়। একটি দেখতে জান্নাতের মতো। অন্যটি জাহান্নামের মতো।
কিন্তু যেটি জান্নাত মনে হবে সেটি আসলে জাহান্নাম। আর যেটি জাহান্নাম মনে হবে সেটি জান্নাত। মুমিনরা এই সত্য জানবে।
সে মানুষকে বলবে, “আমাকে মানো, আমি তোমাকে আমার জান্নাতে নেব।” দুর্বল ঈমানের মানুষ রাজি হবে। আসলে জাহান্নামে যাবে।
যারা অস্বীকার করবে তাদের শাস্তি দেবে। তাদের সম্পদ নষ্ট করবে। পরিবার থেকে আলাদা করবে। কিন্তু তারা ঈমান ছাড়বে না।
হাদিসে আছে এক যুবক দাজ্জালকে চ্যালেঞ্জ করবে। দাজ্জাল তাকে দুই টুকরো করবে। তারপর জীবিত করবে। (বুখারি)
যুবকটি আরও দৃঢ় হয়ে বলবে, “তুমি দাজ্জাল। তোমাকে আমি আরও ভালো চিনতে পেরেছি।” দাজ্জাল দ্বিতীয়বার হত্যা করতে পারবে না।
চল্লিশ দিন পর ঈসা (আ.) অবতরণ করবেন। দামেস্কের সাদা মিনারের কাছে। তিনি দাজ্জালের খোঁজে বের হবেন।
লুদ্দ নামক জায়গায় দাজ্জালকে পাবেন। দাজ্জাল ঈসা (আ.) দেখে গলে যেতে থাকবে। কিন্তু ঈসা (আ.) বর্শা দিয়ে হত্যা করবেন।
দাজ্জালের রক্ত বর্শায় লাগবে। সবাইকে দেখাবেন। মুসলিমরা আনন্দে তাকবির দেবে। এভাবে সবচেয়ে বড় ফিতনার সমাপ্তি ঘটবে।
দাজ্জাল সম্পর্কে ভুল ধারণা
দাজ্জাল সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। মানুষ নানা কাহিনী বানিয়ে ছড়ায়। সঠিক জ্ঞান না থাকায় এসব হয়।
প্রথম ভুল ধারণা হলো দাজ্জাল ইতিমধ্যে এসে গেছে। কেউ বলে ফেরাউন ছিল দাজ্জাল। কেউ বলে নমরুদ। এসব ভুল।
হাদিসে স্পষ্ট বলা আছে দাজ্জাল এখনো আসেনি। সে শেষ যুগে আসবে। ঈসা (আ.) তাকে হত্যা করবেন। এটাই সত্য।
দ্বিতীয় ভুল ধারণা হলো দাজ্জাল মারা গেছে। কেউ মনে করে সে আর নেই। এটাও ভুল। সে এখনো জীবিত আছে।
তামিম দারি (রা.) বর্ণিত হাদিসে স্পষ্ট আছে দাজ্জাল এক দ্বীপে জীবিত। শিকলে বাঁধা অবস্থায় আছে। (মুসলিম)
তৃতীয় ভুল ধারণা হলো দাজ্জাল প্রতীকী। কেউ বলে এটি রূপক অর্থে বলা। আসলে কোনো ব্যক্তি নেই। এটা ভুল।
প্রচলিত ভুল ধারণা তালিকা:
| ভুল ধারণা | সঠিক তথ্য |
| ইতিমধ্যে এসেছে | এখনো আসেনি |
| মারা গেছে | এখনো জীবিত |
| প্রতীকী | বাস্তব ব্যক্তি |
| অনেক দাজ্জাল | শুধু একজন |
| যেকোনো প্রতারক | নির্দিষ্ট ব্যক্তি |
চতুর্থ ভুল ধারণা হলো অনেক দাজ্জাল আছে। কেউ বলে প্রতিটি যুগে দাজ্জাল আসে। এটাও ভুল। দাজ্জাল একজনই।
তবে ছোট ছোট দাজ্জাল (প্রতারক) অনেক আসবে। হাদিসে এটা আছে। কিন্তু প্রধান দাজ্জাল একজনই। (বুখারি ও মুসলিম)
পঞ্চম ভুল ধারণা হলো দাজ্জাল শয়তান। অনেকে মনে করে দাজ্জাল এবং শয়তান একই। এটা ঠিক নয়।
দাজ্জাল হবে মানুষ। কিন্তু শয়তান তার সহায়ক। শয়তান জ্বিন জাতির। দাজ্জাল আদম সন্তান। উভয়ে আলাদা।
ষষ্ঠ ভুল ধারণা হলো দাজ্জালকে দেখা যাবে না। কেউ মনে করে সে অদৃশ্য থাকবে। এটা ভুল।
দাজ্জালকে সবাই দেখতে পাবে। সে প্রকাশ্যে আসবে। মানুষের সামনে দাবি করবে। এবং প্রকাশ্যে অলৌকিক কাজ করবে।
সপ্তম ভুল ধারণা হলো দাজ্জাল অপরাজেয়। অনেকে ভয় পায় তাকে হারানো যাবে না। এটা ভুল চিন্তা।
ঈসা (আ.) তাকে সহজেই হত্যা করবেন। দাজ্জাল পালাতে থাকবে কিন্তু ধরা পড়বে। মিথ্যা কখনো সত্যের বিরুদ্ধে টিকে না।
অষ্টম ভুল ধারণা হলো দাজ্জালের বিরুদ্ধে কিছু করার নেই। কেউ মনে করে তাকদিরে আছে তাই হবেই। এটা ভুল দর্শন।
মুমিনদের প্রস্তুতি নিতে হবে। দোয়া করতে হবে। নেক আমল করতে হবে। তাহলে আল্লাহ রক্ষা করবেন।
নবম ভুল ধারণা হলো দাজ্জাল সম্পর্কে জানা দরকার নেই। কেউ বলে এসব জানলে ভয় পাবে। তাই না জানাই ভালো।
এটা ভুল। রাসুল (সা.) বারবার বলেছেন দাজ্জাল সম্পর্কে। জানলেই বাঁচা সম্ভব। না জানলে প্রতারিত হবে।
দশম ভুল ধারণা হলো দাজ্জালকে মানলে দুনিয়াতে সুখ পাওয়া যাবে। এটা সাময়িক প্রলোভন। আসলে এটি ফাঁদ। আখেরাতে জাহান্নামে যেতে হবে।
দাজ্জাল ও কেয়ামতের আলামত

দাজ্জাল কেয়ামতের দশটি বড় আলামতের একটি। এর পর আর বেশি সময় নেই কেয়ামত হতে। মুসলিমদের সতর্ক থাকা উচিত।
হাদিসে হুজায়ফা (রা.) রাসুল (সা.) কে জিজ্ঞাসা করেন কেয়ামতের আলামত সম্পর্কে। রাসুল (সা.) দশটি আলামতের কথা বলেন। (মুসলিম)
প্রথম আলামত হলো দাজ্জাল। দ্বিতীয় ঈসা (আ.) এর অবতরণ। তৃতীয় ইয়াজুজ মাজুজ। এরপর একের পর এক সব আলামত আসবে।
চতুর্থ আলামত হলো ধোঁয়া। পঞ্চম সূর্য পশ্চিম থেকে উদিত হওয়া। ষষ্ঠ জমিন থেকে এক জন্তু বের হওয়া।
সাতম, অষ্টম ও নবম আলামত হলো তিনটি ভূমিধস। একটি পূর্বে, একটি পশ্চিমে এবং একটি আরব উপদ্বীপে।
কেয়ামতের দশ বড় আলামত:
| ক্রমিক | আলামত | বিবরণ |
| ১ | দাজ্জাল | মিথ্যা খোদা |
| ২ | ঈসা (আ.) | অবতরণ |
| ৩ | ইয়াজুজ মাজুজ | ধ্বংসকারী জাতি |
| ৪ | ধোঁয়া | আকাশ ঢেকে যাবে |
| ৫ | সূর্য | পশ্চিম থেকে উদয় |
| ৬ | জন্তু | জমিন থেকে বের হবে |
| ৭-৯ | ভূমিধস | তিন জায়গায় |
| ১০ | আগুন | ইয়েমেন থেকে |
দশম আলামত হলো ইয়েমেন থেকে এক আগুন বের হওয়া। এটি মানুষকে হাশরের ময়দানে নিয়ে যাবে।
এই দশটি আলামত একের পর এক আসবে। প্রথমটি শুরু হলে বাকিগুলো দ্রুত আসবে। মালার দানা যেমন একটা ছিঁড়লে সব পড়ে যায়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “দশটি আলামত একটির পর একটি আসবে।” (মুসলিম) মানে দাজ্জাল আসলে বুঝতে হবে কেয়ামত খুব কাছে।
দাজ্জালের আগেও কিছু ছোট আলামত আছে। যেমন ইমাম মাহদির আগমন। সিরিয়ায় যুদ্ধ। মুসলিমদের কঠিন সময়।
এসব হওয়ার পর দাজ্জাল বের হবে। তারপর ঈসা (আ.) আসবেন। এরপর ইয়াজুজ মাজুজ। এভাবে একের পর এক।
ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, দাজ্জাল দেখা গেলে বুঝতে হবে কেয়ামত দোরগোড়ায়। তখন তাওবার সময় থাকবে না।
তাই এখন থেকেই তাওবা করা উচিত। নেক আমল বাড়ানো জরুরি। কারণ দাজ্জাল আসার পর তাওবা কবুল হবে না।
মুসলিমদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো এই আলামতগুলো জানা। এবং সে অনুযায়ী জীবন যাপন করা। যাতে কেয়ামতের জন্য প্রস্তুত থাকা যায়।
দাজ্জাল pdf ইসলামিক আলোচনা
দাজ্জাল সম্পর্কে অনেক ইসলামিক বই ও PDF পাওয়া যায়। এসব পড়ে বিস্তারিত জানা সম্ভব। মুসলিমদের এসব পড়া উচিত।
বিখ্যাত কিতাবগুলোর মধ্যে আছে “আল ফিতান” লিখেছেন নুয়াইম ইবনে হাম্মাদ (রহ.)। এতে কেয়ামতের সব আলামত আছে।
“আন নিহায়া ফিল ফিতান ওয়াল মালাহিম” লিখেছেন ইবনে কাসির (রহ.)। এটি খুবই বিস্তারিত কিতাব। দাজ্জাল সম্পর্কে অনেক তথ্য আছে।
“আশরাতুস সাআ” লিখেছেন ইউসুফ আল ওয়াবিল। এতে কেয়ামতের আলামত নিয়ে আলোচনা আছে। সহজ ভাষায় লেখা।
বাংলায় অনেক বই পাওয়া যায়। “দাজ্জাল ও কেয়ামতের আলামত” জনপ্রিয় একটি বই। অনেক লেখক এ বিষয়ে লিখেছেন।
দাজ্জাল বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কিতাব:
| কিতাবের নাম | লেখক | বিষয় |
| আল ফিতান | নুয়াইম ইবনে হাম্মাদ | ফিতনার বিবরণ |
| আন নিহায়া | ইবনে কাসির | কেয়ামত ও দাজ্জাল |
| আশরাতুস সাআ | ইউসুফ আল ওয়াবিল | কেয়ামতের আলামত |
| মিনহাজুল মুসলিম | আবু বকর জাবের | মুসলিমের দিকনির্দেশনা |
অনলাইনে অনেক PDF পাওয়া যায়। ইসলামিক ওয়েবসাইটগুলোতে ফ্রি ডাউনলোড করা যায়। বিশ্বস্ত সাইট থেকে ডাউনলোড করা উচিত।
ইসলামিক স্কলারদের বক্তব্যও শোনা যায়। ইউটিউবে অনেক ভিডিও আছে। তবে সহিহ সূত্র থেকে জানা জরুরি।
দাজ্জাল বিষয়ে পড়ার সময় কুরআন-হাদিসের রেফারেন্স দেখা উচিত। যেকোনো কথা বিশ্বাস করা যাবে না। যাচাই করতে হবে।
অনেক ভুল তথ্যও প্রচলিত আছে। কেউ কেউ নিজের মত করে লিখে। তাই বিশ্বস্ত আলেমদের বই পড়া নিরাপদ।
মাদরাসার কিতাবগুলোতে দাজ্জাল সম্পর্কে সঠিক তথ্য আছে। ফিকহ ও আকিদার কিতাবে এ বিষয় আলোচিত হয়।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এর ফতোয়ায় দাজ্জাল নিয়ে আলোচনা আছে। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) এর “ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন”-এও উল্লেখ আছে।
আধুনিক স্কলারদের মধ্যে শায়খ উসাইমিন (রহ.), শায়খ আলবানি (রহ.), শায়খ ইবনে বাজ (রহ.) দাজ্জাল নিয়ে লিখেছেন।
মুসলিমদের উচিত এসব বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করা। পরিবারের সবাইকে জানানো। যাতে সবাই প্রস্তুত থাকে।
দাজ্জাল সম্পর্কে জানা শুধু জ্ঞানের জন্য নয়। এটি ঈমান রক্ষার জন্য জরুরি। সঠিক জ্ঞান থাকলে বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
উপসংহার
দাজ্জাল ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি কেয়ামতের বড় আলামত। প্রতিটি মুসলমানের এ সম্পর্কে জানা উচিত। কারণ এটি ঈমানের পরীক্ষা হবে।
রাসুল (সা.) বারবার দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। প্রায় প্রতিটি খুতবায় এ বিষয়ে বলতেন। এটি প্রমাণ করে এই ফিতনা কতটা ভয়ংকর।
দাজ্জাল এক চোখবিশিষ্ট হবে। কপালে ‘কাফির’ লেখা থাকবে। সে নিজেকে খোদা দাবি করবে। অলৌকিক শক্তি প্রদর্শন করবে। কিন্তু মুমিনরা তাকে চিনবে।
চল্লিশ দিন সে পৃথিবীতে থাকবে। মানুষকে বিভ্রান্ত করবে। দুর্বল ঈমানের মানুষ প্রতারিত হবে। কিন্তু শক্তিশালী ঈমানদাররা টিকে থাকবে।
হযরত ঈসা (আ.) অবতরণ করবেন। তিনি দাজ্জালকে হত্যা করবেন। এভাবে সবচেয়ে বড় ফিতনার সমাপ্তি ঘটবে। সত্যের বিজয় হবে।
মুসলিমদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া। ঈমান মজবুত করা। কুরআন-হাদিস পড়া। নেক আমল বাড়ানো। নিয়মিত দোয়া করা।
সুরা কাহাফ মুখস্থ করা খুবই জরুরি। বিশেষ করে প্রথম দশ আয়াত। প্রতি জুমায় পড়া সুন্নত। এটি দাজ্জাল থেকে সুরক্ষা দেয়।
দাজ্জাল সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখা জরুরি। ভুল ধারণা থেকে বাঁচতে হবে। সহিহ হাদিস পড়তে হবে। বিশ্বস্ত আলেমদের কথা শুনতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা করুন। ঈমানের উপর অটল রাখুন। এবং সঠিক পথ দেখান। আমিন।
লেখকের নোট: এই নিবন্ধে দাজ্জাল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সব তথ্য কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে নেওয়া। মুসলিমদের উচিত এসব জানা এবং প্রস্তুত থাকা।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। সঠিক পথে রাখুন। এবং ঈমানের উপর অটল রাখুন। আমিন ইয়া রাব্বাল আলামিন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)
দাজ্জাল কে?
দাজ্জাল হলো এমন এক ব্যক্তি যে নিজেকে খোদা দাবি করবে। সে হবে সবচেয়ে বড় প্রতারক। তার এক চোখ অন্ধ হবে। কপালে ‘কাফির’ লেখা থাকবে।
দাজ্জাল কবে আসবে?
সঠিক সময় কেউ জানে না। তবে কেয়ামতের খুব কাছাকাছি সময়ে আসবে। ইমাম মাহদির পরে এবং ঈসা (আ.) এর আগমনের আগে।
দাজ্জাল কত দিন থাকবে?
মোট চল্লিশ দিন। প্রথম দিন এক বছরের সমান। দ্বিতীয় দিন এক মাসের সমান। তৃতীয় দিন এক সপ্তাহের সমান। বাকি ৩৭ দিন স্বাভাবিক।
দাজ্জালকে কে হত্যা করবে?
হযরত ঈসা (আ.) দাজ্জালকে হত্যা করবেন। ফিলিস্তিনের লুদ্দ নামক স্থানে। তিনি বর্শা দিয়ে হত্যা করবেন।
দাজ্জাল এখন কোথায় আছে?
পূর্ব দিকের এক দ্বীপে বন্দি আছে। শিকলে বাঁধা অবস্থায়। জাসসাসা নামক প্রাণী তাকে পাহারা দিচ্ছে।
দাজ্জাল কি এখনো জীবিত?
হ্যাঁ, সে এখনো জীবিত আছে। তামিম দারি (রা.) বর্ণিত সহিহ হাদিস থেকে এটি প্রমাণিত। আল্লাহ তাকে দীর্ঘ জীবন দিয়েছেন।
দাজ্জাল থেকে বাঁচার উপায় কী?
ঈমান মজবুত করা। সুরা কাহাফ মুখস্থ করা। নিয়মিত দোয়া পড়া। নেক আমল করা। এবং তার কাছ থেকে দূরে থাকা।
দাজ্জালের চেহারা কেমন?
লাল বর্ণের। লম্বা উচ্চতা। মোটা শরীর। ঘন কোঁকড়ানো চুল। ডান চোখ অন্ধ। কপালে ‘কাফির’ লেখা থাকবে।
দাজ্জাল কোথা থেকে বের হবে?
ইসফাহান থেকে বের হবে। ইরানের একটি শহর। সত্তর হাজার ইহুদি তার সাথে থাকবে।
দাজ্জাল কি মক্কা-মদিনায় যেতে পারবে?
না। ফেরেশতারা মক্কা ও মদিনার প্রবেশপথ পাহারা দেবেন। দাজ্জাল এই দুই শহরে প্রবেশ করতে পারবে না।
দাজ্জালের সাথে কী থাকবে?
জান্নাত ও জাহান্নামের মতো দুটি বিষয় থাকবে। কিন্তু তার জান্নাত হবে আসলে জাহান্নাম। আর জাহান্নাম হবে জান্নাত।
দাজ্জাল কি অলৌকিক শক্তি পাবে?
হ্যাঁ। আল্লাহ তাকে পরীক্ষা হিসেবে বিশেষ শক্তি দেবেন। বৃষ্টি আনা, ফসল ফলানো এবং মৃতকে জীবিত করার দাবি করবে।
সুরা কাহাফ কেন পড়তে হবে?
হাদিসে আছে যে সুরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করলে দাজ্জাল থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। প্রতি জুমায় পড়া সুন্নত।
দাজ্জালের পরে কী হবে?
হযরত ঈসা (আ.) শাসন করবেন। পৃথিবীতে শান্তি আসবে। ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে। চল্লিশ বছর স্বর্ণযুগ চলবে।
ইমাম মাহদি কে?
রাসুল (সা.) এর বংশধর। তিনি দাজ্জালের আগে আসবেন। মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করবেন। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন।
দাজ্জাল কি কুরআনে আছে?
সরাসরি নাম নেই। তবে সুরা কাহাফে তার ফিতনার ইঙ্গিত আছে। হাদিসে বিস্তারিত বর্ণনা আছে।
দাজ্জালের দোয়া কী?
“আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন ফিতনাতিল মাসিহিদ দাজ্জাল।” প্রতিটি নামাজে পড়া সুন্নত।
ইয়াজুজ মাজুজ কারা?
এক বিশাল জাতি। দাজ্জালের পরে আসবে। ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করবেন।
দাজ্জাল সম্পর্কে বিশ্বাস কি ফরজ?
হ্যাঁ। এটি ঈমানের অংশ। সহিহ হাদিসে স্পষ্ট আছে। যে অস্বীকার করবে তার ঈমান বিপদে পড়বে।
দাজ্জালের সময় কী করব?
দূরে থাকা। মক্কা-মদিনায় যাওয়া। পাহাড়ে লুকানো। নিয়মিত দোয়া করা। ঈমান মজবুত রাখা। ধৈর্য ধারণ করা।
🔥 পোস্টটি শেয়ার করুনঃ 📲






